সকল মেনু

আশ্রিতদের কাছে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান

আজ থেকে ৯ বছর আগে পাহাড়ি দুর্গম পথ পেরিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে পরিবারের ৪ সদস্যসহ উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ (২৮)।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সেই স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মিলিটারির (জান্তা) হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে ৮ দিন হাঁটার পর এদেশে এসেছিলাম। তখনের কথা মনে পড়লে কান্না পায় এখনো, কিন্তু সেটা আমার দেশ আমার ভূমি। সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে আরিফুল্লাহর মতো বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দা তথা রোহিঙ্গা রয়েছে ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন।

২০২৩ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারের জান্তা নিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির তুমুল সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়, যা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। ফলে ২০২৪ এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নতুন করে আরো প্রায় ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

রাখাইনের অনিশ্চিত পরিস্থিতির পরও ঘরে ফিরতে উন্মুখ রোহিঙ্গারা, আর সে লক্ষ্যে আশ্রিতদের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে ২০২৫ সালে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে ইউসিআরের প্রতিনিধি নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

১৪টি শ্রেণি থেকে বাছাই করা হয় ভোটার। যারা হলেন- ইমাম, মুহতামিম, ছাত্র, শিক্ষক, ওকতা (চেয়ারম্যান), নারী প্রতিনিধি, সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী, হেড মাঝি, প্রবীণ নাগরিক, কমিউনিটি ডাক্তার, ব্যবসায়ী, যুবক, ক্যাম্পভিত্তিক সংগঠন ও প্রবাসী রোহিঙ্গা।

সংগঠনটি বর্তমানে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী নেতৃত্ব ও সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইতোমধ্যে ক্যাম্পগুলোতে পরিচিতি অর্জন করেছে।

ইউসিআরে যুক্ত সদস্যরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ সমন্বয়ে বর্তমানে ইউসিআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পাশাপাশি ক্যাম্পে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ ফুরকান মির্জা বলেন, ইউসিআর প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পারে। এই সংগঠন আমাদের ঐক্য, জবাবদিহিতা এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোহিঙ্গা অধিকার কর্মী সৈয়দ উল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ, তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং জীবন বাঁচিয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলো আমাদের সহায়তা করছে। আমরা এখানে স্থায়ী নই, আমাদের ঠিক একদিন ফিরতে হবে আমাদের নিজ দেশে। রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

রোহিঙ্গা সংকটের কারণে নানা সমস্যার ভুক্তভোগী উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয়রা। তারাও বলছেন, রোহিঙ্গারা নিজেদের অধিকার নিয়ে ঘরে ফিরুক।

স্থানীয় তরুণ আইনজীবী ব্যরিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের অতিথি আমরা তাদের মানবিক আশ্রয় দিয়েছি৷ কিন্তু বর্তমানে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চাপে আমাদের নানা সমস্যা পোহাতে হচ্ছে৷ বর্তমান সরকারের কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন তৎপরতা দৃশ্যমান, আমরা চাই অচিরেই রোহিঙ্গারা ফিরে যাক তথা সুন্দর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিবেশ তৈরি হোক।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ১২ লাখের বেশি মানুষকে যদি ধাপে ধাপে ফেরত পাঠাতে হয়, তাহলে কাজটি কত দীর্ঘ হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়। শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। মর্যাদার সঙ্গে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের ওপারে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ২৭১ কিলোমিটার এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে আরকান আর্মি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী রাখাইনের ১৭ টি টাউনশিপের ১৪টিই সশস্ত্র সংগঠনটি নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু জান্তা নিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করায় প্রদেশটিতে সংঘাত দীর্ঘতর হচ্ছে।

চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়াকে প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি চলমান সংঘাতের কারণে হয়ে উঠছে না তাই আগে সংঘাত শেষ হতে হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এসব শর্ত তৈরি করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার নয় বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রুপরেখা প্রণয়ন সহ সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, আগামীকাল ২৫ আগস্ট ৯ম বারের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালিত হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top