সকল মেনু

আশাহীনতায় পথশিশু: মাদক ও অপরাধে ফিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

রাজধানীর কমলাপুর, খিলগাঁও, বাসাবো, গুলিস্তানসহ ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত কিংবা রেল স্টেশনের প্লাটফর্ম- যেখানে মানুষের ভিড়, সেখানেই দেখা মেলে উসকো-খুসকো চুল, ছেঁড়া জামা, মুখে ও গায়ে আঘাতের দাগ, অপরিচ্ছন্ন ছোট ছোট কিছু মুখ। এরা পথশিশু। কেউ কেউ জন্মের পর থেকেই বঞ্চনা, অবহেলা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছে। আবার কেউ পিতামাতার বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর কারণে বাড়ি ছাড়া হয়েছেন। রাষ্ট্রেয় ছায়াহীন হয়ে রাস্তায় বেড়ে ওঠা এই শিশুরা দিন দিন জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধ ও মাদকের ভয়ংকর জালে।

ছিন্নমূলদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, দেশে ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। যদিও বিআইডিএস ২০২৪ এর তথ্য বলছে, এই সংখ্যা ১২ থেকে ১৭ লাখ। এসব পথশিশুদের প্রতি ১০ জনের আটজনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার।

শিশুদের প্রতি তিনজনের প্রায় একজন খোলা জায়গায় ঘুমায়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এই শিশুরা জীবন যুদ্ধ করেই কোন মতে টিকে থাকে। পথশিশুদের ৬০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভোগে আর ৮৫ ভাগই কোন না কোন ভাবে মাদকাসক্ত।

পরিবারহীন পথশিশুদের খুব অল্প একটা অংশ সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় আশ্রয় পায়। নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন এ শিশুদের সামান্য অংশই দেখতে পারে।

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটই তাদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে। জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পেরে অনেকেই প্রথমে ছোটখাটো কাজ বা ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত হয়। পরে টিকে থাকার তাগিদে চুরি, ছিনতাই কিংবা মাদক পরিবহনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার তালতলা মার্কেটের বারান্দায় থাকে বায়েজিদ। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। কয়েক বছর আগে তার মা মারা যান। বাবা সৌদি প্রবাসী। বায়েজিদ থাকতো দাদির কাছে। বাবা প্রতি মাসে তার জন্য টাকা পাঠালেও দাদি তাকে টাকা দিতো না। ঠিক মতো খেতে দিতো না। বাবা তাকে একটা সাইকেল কেনার টাকা দিলেও দাদি তা কিনে দেয় নি। অভিমানে দুই বছর আগে ঢাকার বাসে উঠে সায়েদাবাদ নেমে বাসাবো আসলে লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে খিলগাঁও তালতলা এসে আশ্রয় নেয়। এখন ঊনিশজনের সাথে সে মার্কেটের বিভিন্ন স্থানে রাত কাটায়।

খেয়ে না খেয়েই দিন কাটাচ্ছে বায়েজিদ। সকালে ঘুম থেকে উঠে বিভিন্ন খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কারও কাছ থেকে খুঁজে সকালের নাস্তাটা সেরে নেয়। এরপর শুরু হয় খাবার কিনবে বলে টাকা সংগ্রহ। টাকা দিয়ে কী করে জিজ্ঞেস করলে জানায়, এখানকার কয়েকজন বড়ভাই রাতে এসে তাদের কাছ থেকে ৫০/১০০ টাকা চাঁদা নিয়ে যায়। বড় ভাইরা কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, তারা তাদের বাসায় থাকে। বাকি টাকা দিয়ে কী করে জিজ্ঞেস করলে বলে, টাকা জমিয়ে রাখে।

কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পারে, তালতলা মার্কেটের দ্বিতীয় তলার উত্তর-পূর্ব কোনায় গেমিং জোনে গিয়ে চল্লিশ টাকার বিনিময়ে অন্য পথশিশুদের সঙ্গে একঘন্টা গেমস খেলে বা গেমিং ভিডিও দেখে বায়েজিদ। আবার কেউ কেউ আশি থেকে একশো টাকার বিনিময়ে জুতার ঘাম বা ডেন্ডি কিনে নেশা করে।

তালতলার আরেক পথশিশু তাইমুদের (১৩) সাথে কথা বলে জানা যায়, মা মারা যাওয়ার পর বাবা আরেকটা বিয়ে করে তাকে এখানে এনে রেখে যায়। সেই থেকে কখনও ভালো বিছানায় ঘুমানো হয়নি তার। রাত কাটে তালতলার মসজিদ মার্কেটের বারান্দায়। তার সকালের নাস্তা হয় ১২:৩০টায়। কোন কাজ করে কিনা জিজ্ঞেস করলে সে বলে, মাঝে মধ্যে কাজ করি সবসময় করা হয় না।

“শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব না। তাদেরকে ভালোবাসা, শিক্ষা এবং বিকল্প জীবনের পথ দেখাতে হবে। তাহলেই তারা মূলধারায় ফিরে আসতে পারবে।”

কমলাপুর এলাকায় কথা হয় ১২ বছর বয়সী রাকিবের সঙ্গে। সে জানায়, বাসা থেকে অভিমান করে বেরিয়ে এসে প্রথমে বন্ধুদের সাথে আঠা শুঁকে, পরে ইয়াবা খাওয়া শুরু করে। এখন না খেলে ভালো লাগে না।

মাদক কেনার টাকা কোথায় পায় জিজ্ঞেস করলে রাকিব জানায়, মানুষের কাছে খুঁজে যা পাই তাই দিয়ে কিনি। ডেন্ডির দাম কম হওয়ায় সেটি সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু ইয়াবা কেনার জন্য মাঝে-মধ্যে সম্মিলিত ছিনতাই করতে হয় তাদের এবং ছোটখাট চুরিও করে থাকে। আবার রাস্তার পাশের খালি পানি বোতল বিক্রি করেও কিছু আয় হয়। ছিনতাই কিভাবে শিখেছে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, তাদের বড়ভাইরা শিখিয়েছে।

এছাড়াও খিলগাঁও, মালিবাগ রেললাইনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বসে অকাতরে ডেন্ডি শুঁকা ছেলেদের মতো অসংখ্য পথশিশু খুব অল্প বয়সেই মাদকের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আবার মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য নানা অপরাধেও যুক্ত হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, প্রায় ৫৮% পথশিশু কোনো না কোনো মাদক গ্রহণ করে এবং ২১% শিশু মাদক বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, “পথশিশুরা অনেক সময় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের টার্গেটে পরিণত হয়। তাদের ব্যবহার করে মাদক বহন, চুরি ও অন্যান্য অপরাধে জড়ানো হয়। এসব চক্র শনাক্ত করে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযানে পথশিশুদের গ্রেপ্তারের চেয়ে আমরা তাদের পুনর্বাসনের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিই। শিশুদের অপরাধী নয়, ভুক্তভোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে।”

পুলিশের মতে, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মাদক সরবরাহ চক্র ভাঙতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু আইনের আওতায় মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটই তাদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে। জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পেরে অনেকেই প্রথমে ছোটখাটো কাজ বা ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত হয়। পরে টিকে থাকার তাগিদে চুরি, ছিনতাই কিংবা মাদক পরিবহনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

“রাষ্ট্রের শক্ত এবং সমন্বিত উদ্যোগ খুব জরুরি। পথশিশুদের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন সবকিছু একসাথে থাকবে। প্রতিটি বড় শহরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ও স্থায়ী শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শিশুরা রাস্তায় না থেকে সুরক্ষিত পরিবেশে বড় হতে পারে। অনেক শিশুই দারিদ্র্য বা পারিবারিক সমস্যার কারণে রাস্তায় আসে, তাই পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা খুবই জরুরি।”

সমাজকর্মীরা মনে করেন, এই সমস্যার সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, দারিদ্র্য বিমোচন ও কঠোর আইন প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

সমাজর্মী নেয়ামত হোসেন বলেন, “শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব না। তাদেরকে ভালোবাসা, শিক্ষা এবং বিকল্প জীবনের পথ দেখাতে হবে। তাহলেই তারা মূলধারায় ফিরে আসতে পারবে।”

পথশিশুরা কোনো অপরাধী হয়ে জন্মায় না, পরিস্থিতিই তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। তাই এই শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গিই পারে তাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে- যোগ করেন নেয়ামত হোসেন।

জাতীয় শিশু সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসরের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি জাবির আবদুল্লাহ জানান, তারা পথশিশুদেরকে অসচ্ছল শিশু হিসেবে প্রমোট করে। ইতোমধ্যে তারা কক্সবাজারে অসচ্ছল শিশুদের জন্য একটা সেবা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। যেখানে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য সাপ্তাহিক ক্লাসের আয়োজন থাকে। এছাড়াও সারাদেশে তাদের ঊনআশিটি শাখা কাজ করছে শিশুদের জন্য। এছাড়াও তারা ‘শিশু সেবা’ নামে একটি অনুদান বক্সে ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিচ্ছে যেখানে প্রতিদিন অসচ্ছল শিশুদের জন্য দুই টাকা করে জমা হবে বলে জানান তিনি। সেটি দিয়ে তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সেবা ও বৃত্তি সেবা দিয়ে থাকেন।

পথশিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা নাজমুল হাসান জানান, আমরা শুধু সহানুভূতি দেখাতে চাই না, আমরা চাই বাস্তব পরিবর্তন আনতে। আমাদের বিশ্বাস, প্রতিটি শিশুরই শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার আছে। রাস্তার এই কঠিন জীবন থেকে শিশুদের সরিয়ে এনে তাদের হাতে বই তুলে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য থেকেই আমরা ‘অদম্য স্কুল’ পরিচালনা করছি, যেখানে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শুধু অক্ষর জ্ঞানই নয়, নৈতিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং একটি নিরাপদ, ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা চাই না তারা সারাজীবন “পথশিশু” পরিচয়ে আটকে থাকুক। আমরা তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে এবং একসময় দেশের সম্পদে পরিণত হয়। সহজভাবে বললে, আমাদের এজেন্ডা হলো তাদের জীবনে সাময়িক সাহায্য নয়, বরং স্থায়ী পরিবর্তন আনা।

এখানে রাষ্ট্রের শক্ত এবং সমন্বিত উদ্যোগ খুব জরুরি। পথশিশুদের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন সবকিছু একসাথে থাকবে। প্রতিটি বড় শহরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ও স্থায়ী শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শিশুরা রাস্তায় না থেকে সুরক্ষিত পরিবেশে বড় হতে পারে। অনেক শিশুই দারিদ্র্য বা পারিবারিক সমস্যার কারণে রাস্তায় আসে, তাই পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা খুবই জরুরি- যোগ করেন নাজমুল হাসান।।

পথশিশুদের এ সমস্যাকে দানের বিষয় হিসেবে না দেখে অধিকার হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। একইসঙ্গে সরকার, বেসরকারি সংগঠন ও নাগরিকরা যুগপথ কাজ করলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে উল্লেখ করেন পথশিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top