বাংলাদেশে দ্রুত বাড়তে থাকা হাম সংক্রমণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি বাংলাদেশকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণের বিস্তার এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনায় এই সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০-এর বেশি। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের, যাদের বেশির ভাগই শিশু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে টিকাদান জোরদার করা প্রয়োজন।
হাম সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে। শুধু ঢাকা বিভাগেই ৮ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকা—ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল ও মিরপুরে রোগীর চাপ বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আক্রান্তদের ৮৩ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আগে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার ঘাটতি সেই অগ্রগতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক ও সম্পূরক হাম-রুবেলা কর্মসূচি বন্ধ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সংখ্যা বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচলের কারণে আন্তসীমান্ত সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেও ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
৩০ মার্চ জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদনের পর ৫ এপ্রিল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১৮ জেলায় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী এ কর্মসূচি চালু করা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, জরুরি টিকা সংগ্রহ, ভিটামিন এ সরবরাহ, হাসপাতাল প্রস্তুতি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয় করার কাজ চলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাকভারেজ নিশ্চিত করা, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।