সকল মেনু

উত্তর প্রদেশের ঝড়: বাংলাদেশের জন্য কতটা সতর্কবার্তা?

সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশে ভয়াবহ ঝড়ে ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, সেটি শুধু প্রতিবেশী দেশের একটি দুর্যোগ নয়। আবহাওয়াবিজ্ঞান, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্য, বিশেষত ঢাকার মতো অতিঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা বহন করছে।

উত্তর প্রদেশে এই ঝড় এসেছে মার্চ থেকে জুনের মাঝামাঝি — বার্ষিক বর্ষার আগের সেই উত্তপ্ত মৌসুমে, যখন উত্তর ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে কালবৈশাখী ও ধুলোঝড়ের প্রকোপ থাকে। বাংলাদেশেও ঠিক একই সময়কাল সবচেয়ে বিপজ্জনক। কালবৈশাখী, বজ্রঝড় এবং আগাম ঘূর্ণিঝড় — সবই এই মৌসুমের সঙ্গী। উত্তর প্রদেশ ও বাংলাদেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি নয়, আর দুটি অঞ্চলই একই বায়ুমণ্ডলীয় ব্যবস্থার অধীনে।

ঢাকা: বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, প্রস্তুতি কতটুকু?

ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করেন ৪৭ হাজার ৫০০ জন মানুষ। প্রতি বছর আরও চার লাখ মানুষ নতুন করে ঢাকায় আসছেন। এই ঘনত্বে যদি উত্তর প্রদেশের মতো একটি ঝড় আসে, তাহলে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

উত্তর প্রদেশে মানুষ মারা গেছেন গাছ পড়ে, দেয়াল ধসে এবং বজ্রপাতে। ঢাকার পুরনো অংশে অগণিত জরাজীর্ণ ভবন, সরু গলি, অপরিকল্পিত বিদ্যুতের তার এবং ঘিঞ্জি বসবাস — এই পরিবেশে একটি শক্তিশালী ঝড় কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশের ঝুঁকি: বিজ্ঞান কী বলছে

বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাস। দেশটি নিয়মিত তীব্র বজ্রঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং বজ্রপাতের মুখে পড়ে। মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ১৯টি উপকূলীয় এলাকায়, যার বেশিরভাগ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই মিটার উপরে। এই অঞ্চলে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকিতে থাকেন।

জার্মান দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ সংস্থা জার্মানওয়াচের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৬-এ বাংলাদেশ ১৩তম স্থানে রয়েছে। ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই সূচকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক দুর্যোগপ্রবণতা স্পষ্ট।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বাংলাদেশে ১০০ বছর অন্তর আসা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ ৩.৫ মিটার থেকে বেড়ে ৪.৯ থেকে ৫.৪ মিটারে পৌঁছাতে পারে।

বঙ্গোপসাগরের ‘ফানেল’ — বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক সমস্যা

বঙ্গোপসাগর উত্তরে সংকীর্ণ হতে হতে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে এসে মেলে। এই ফানেল আকৃতি ঘূর্ণিঝড়কে বাংলাদেশের দিকে টেনে আনে এবং একই সঙ্গে তার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। এটি শুধু উপকূলের সমস্যা নয়। উপকূল থেকে আসা ঝড়ের প্রভাব দ্রুত ঢাকাসহ ভেতরের জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।

পূর্বাভাসের দুর্বলতা

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসে ভুল করে, যার ফলে দুর্যোগকালে মৃত্যু ও সম্পদহানি বাড়ে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় ভুল পূর্বাভাস নিয়ে সারাদেশে আলোচনা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল বলেছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।

উত্তর প্রদেশে ঝড়ের আগে রাজ্য প্রশাসন সতর্কতা জারি করেছিল, তবু ১০৪ জন মারা গেছেন। বাংলাদেশে পূর্বাভাস ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে এবং একটি অপ্রস্তুত ঢাকায় এমন ঝড় আসলে পরিণতি কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

২০৫০ সালের মধ্যে বিপদ আরও বাড়বে

বিশ্বব্যাংকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এক কোটি ৯৯ লাখ পর্যন্ত মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। এই বিশাল সংখ্যার বড় অংশ ঢাকায় আসবেন, যেখানে বসবাসের পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই সীমার কাছাকাছি। ঘনত্ব বাড়লে দুর্যোগের ক্ষতিও বাড়বে সমানুপাতিক হারে।

বাংলাদেশ প্রতি বছর আবহাওয়াজনিত ঘটনায় প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলারের ফসল হারায়। শহরে একটি বড় ঝড়ের আর্থিক ক্ষতি এর চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কী করণীয়

উত্তর প্রদেশের ঘটনা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে। পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, শহরে পর্যাপ্ত গাছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাতে ঝড়ে গাছ পড়ে মানুষ না মারা যায়, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভূগর্ভস্থ করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য করে তোলা — এই বিষয়গুলো এখনই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

উত্তর প্রদেশের ঝড় হয়তো হাজার কিলোমিটার দূরে ঘটেছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, বাংলাদেশ — বিশেষত ঢাকা — এই ধরনের ঘটনার জন্য প্রস্তুত নয়। প্রকৃতি সতর্ক করছে, প্রশ্ন হলো আমরা শুনছি কি না।

সূত্র: জার্মানওয়াচ ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৬, এমআইটি গবেষণা, বিশ্বব্যাংক, ক্লাইমেট রিয়েলিটি প্রজেক্ট, নেচার ইনসাইটস, আল জাজিরা, রয়টার্স

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top