সকল মেনু

ঘরে পচে, বাজারে দাম নেই: সালথায় পেঁয়াজ চাষিদের নীরব কান্না

আরিফুল ইসলাম, সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি

পেঁয়াজের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত ফরিদপুরের সালথা উপজেলা। মৌসুমে উপজেলার আবাদি জমির প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশেই পেঁয়াজের চাষ হয়। এ অঞ্চলের উৎপাদিত পেঁয়াজ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এবার বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।

কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি এবং বীজের দাম বাড়ায় পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে তাদের খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা মণ দরে। ফলে লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।

শুধু কম দামই নয়, মজুদ করে রেখেও রক্ষা হচ্ছে না কৃষকদের। মাচায় রাখা পেঁয়াজের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পচে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। অনেক কৃষকের পুরো মাচার পেঁয়াজই নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকদের পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সালথার ৮টি ইউনিয়নে মোট কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। উপজেলার মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে ৩০ হাজারের বেশি কৃষক প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছেন।

চলতি মৌসুমে উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১ হাজার ২৫০ হেক্টর। সেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ হেক্টরে মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং ৫০ হেক্টরে বীজ পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। ফলে এ বছর সালথায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে।

উপজেলার সালথা সদর বাজার, নকুলহাটি, ঠেনঠেনিয়া, মোন্তারমোড়, ফুলবাড়িয়া, মাঝারদিয়া, সোনাপুর ও বালিয়া বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পেঁয়াজের দাম মণপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না।

প্রতি বছর অনেক কৃষক মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজ বিক্রি না করে মাচায় সংরক্ষণ করে রাখেন। পরে মৌসুমের শেষ দিকে দাম বাড়লে বিক্রি করে কিছুটা লাভের আশা করেন তারা। কিন্তু এবার সংরক্ষণ করা পেঁয়াজও পচে যাওয়ায় সেই আশাও ভেস্তে যাচ্ছে।

সালথা সদর বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মো. মাসুম সরদার বলেন, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি এবং মোকামে চাহিদা কম থাকায় দাম কমেছে। রোববার ৭০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। তবে চিকন বা ছোট পেঁয়াজের দাম ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। আগামী মাসের প্রথম দিকে দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম হওয়ায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। তাদের দাবি, কৃষি প্রণোদনা বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজন ছাড়া পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখারও দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আহসানুল হাবিব আল আজাদ জনি বলেন, চলতি বছর কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ৮০০ কৃষকের মধ্যে বিনা মূল্যে পেঁয়াজের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। পেঁয়াজের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, কৃষকেরা পেঁয়াজের ন্যায্য মূল্য পাবেন।

তিনি আরও বলেন, কৃষি প্রণোদনা বাড়ানোর পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষণাগার নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

বাম্পার ফলনের পরও উৎপাদন খরচের নিচে পেঁয়াজ বিক্রি এবং মাচায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ পচে যাওয়ায় সালথার কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কৃষকদের ভাষায়, মাঠে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম না থাকায় সেই সাফল্য এখন তাদের কাছে ‘নীরব কান্না’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top