আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণ ও রাজস্ব আয় বাড়াতে আগামী বাজেটে করছাড় কমানোর পথে হাঁটছে সরকার। বিভিন্ন খাতে দেওয়া শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি পুনর্মূল্যায়ন করে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
নীতিনির্ধারণ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কর অব্যাহতি কমানো হলে প্রায় ৩০০ পণ্য ও সেবার ওপর নতুন করে শুল্ক ও কর আরোপ হতে পারে। এতে বাজারে মূল্যচাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে বর্তমানে ভ্যাটের আদর্শ হার ১৫ শতাংশ। এর চেয়ে কম যেকোনো কার্যকর হারকেই ভ্যাট অব্যাহতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
সরকার মোটাদাগে তিনটি উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে- আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক। এর মধ্যে ভ্যাট থেকেই এককভাবে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মোট রাজস্বের ৩৮ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি এসেছে ভ্যাট থেকে।
তবে সরকার বছরে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে, তার প্রায় সমপরিমাণ রাজস্ব কর অব্যাহতির কারণে ছাড় দিতে হয় বলে এনবিআরের বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে।
“আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। বর্তমানে এ হার ৬.৬৭ শতাংশ, যা আগামী অর্থবছরে ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্কে দেওয়া বিভিন্ন অব্যাহতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করলেও প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অব্যাহতি দিয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট অব্যাহতির পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি- প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন এবং বিপণনসহ ৫৩টি ক্যাটাগরির অধীনে কয়েকশো পণ্য ও সেবায় সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি পাচ্ছে। এই অব্যাহতির সুবিধা ৯টি মৌলিক সেবা, ১১ ধরনের সমাজকল্যাণমূলক সেবা, ৭টি সাংস্কৃতিক সেবা, ৪টি আর্থিক সেবা, ৫টি পরিবহন সেবা এবং আরও ১২টি ব্যক্তিগত ও বিবিধ সেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
পূর্ণ অব্যাহতির বাইরেও ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইনের তৃতীয় তফসিলে থাকা বিভিন্ন পণ্য ও সেবা থেকে কম হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট সেবা, আসবাবপত্র, গয়না, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার সামগ্রী এবং নির্দিষ্ট কিছু উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম।
এছাড়া বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের (এসআরও) মাধ্যমেও বিভিন্ন পণ্য ও সেবার পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড), অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে পণ্য উৎপাদনে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়। একইসঙ্গে রপ্তানি উৎসাহিত করতে কাঁচামালসহ বিভিন্ন খাতে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। বর্তমানে এ হার ৬.৬৭ শতাংশ, যা আগামী অর্থবছরে ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্কে দেওয়া বিভিন্ন অব্যাহতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
“জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে কর অব্যাহতি হঠাৎ কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হতে পারে।”
এনবিআরের একটি সূত্র জানিয়েছে, কোন খাতে কতটুকু করছাড় কমানো হবে, তা নির্ধারণে ইতিমধ্যে এনবিআর তিনটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিগুলো শিগগিরই প্রতিবেদন দেবে। প্রাথমিকভাবে কৃষিপণ্য এবং যেসব কর সুবিধার মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, সেগুলোকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হতে পারে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিবেচনায় করছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব সুবিধার একটি বড় অংশ সরাসরি ভোক্তা বা শ্রমিকদের উপকারে না এসে রাজস্ব ঘাটতি বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে করছাড় কমানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে কর অব্যাহতি হঠাৎ কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হতে পারে।
এনবিআরের সদস্য (কর নীতি) মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, সব করছাড় একসঙ্গে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা ও আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে কর অব্যাহতির পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।