মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর ধাক্কা লেগেছে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এলপিজি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা এখন ভোক্তাদের জন্য বড় এক সংকটে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা, বিশেষ করে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকারের ব্যবহার বাড়ছে। এতে লোডশেডিং বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এর সতত্য পেয়েছে আরটিএনএন।
এলপিজির দামে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার “থ্রি ব্রাদার্স” হোটেলের কর্মী ফাহিম ইসলাম জানান, রমজানের আগে ৩৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার যেখানে ৩৮০০-৩৯০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেই একই সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৫০০ থেকে ৬২০০ টাকায়। এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে গিয়ে হোটেল মালিকরা খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। “আগে মুরগির মাংসের আইটেম ৭০ টাকা ছিল, এখন ৮০ টাকা নিতে হচ্ছে,” বলেন ফাহিম।
আর “শেখ ফরিদ ফাস্টফুড”-এর মালিক শেখ ফরিদ নিজেই জানান, তিনি এখন আর গ্যাসই পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে কেরোসিন চালিত চুলা ব্যবহার করছেন। যেখানে প্রতিদিন ৩ লিটার তেল খরচ হচ্ছে, যার দাম প্রায় ৩৭৫ টাকা। এটা তার মুনাফার প্রায় সিংহভাগ কমিয়ে দিয়েছে বলে মনোকষ্ট জানান তিনি।
“আগে গ্যাসওয়ালারা জোর করে সিলিন্ডার দিয়ে যেত, এখন তাদের দেখা পাওয়া যায় না,” -আক্ষেপ তার কণ্ঠে।
ছোট ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াই
মিরপুর-১০ এলাকার চা বিক্রেতা জসিম জানান, জানুয়ারিতে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ১২৫০-১৩০০ টাকায়, আর এখন সেটির দাম ১৯০০ টাকা ছাড়িয়েছে। তবে তিনি কৌশলে খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন। বাসা থেকে গরম পানি এনে ব্যবহার করছেন, যাতে গ্যাস কম খরচ হয়।
“আগে ৯ দিন চলত, এখন ১২ দিন চালাতে পারি,” -বললেন তিনি। অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা রিফাত গ্যাসের বাড়তি খরচ সামলাতে ইলেকট্রিক হিটার ব্যবহার শুরু করেছেন। চায়ের জন্য পানি এখন বিদ্যুতে গরম করছেন তিনি।
পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের বৈষম্য
মিরপুরের একটি পাইকারি প্রতিষ্ঠান “ইব্রাহীম ট্রেড লিংক”-এ গত ১৪ এপ্রিল গিয়ে জানা যায়, তারা ১২ কেজির সিলিন্ডার ডিলার পয়েন্ট থেকে ১৮০০ টাকায় কিনে ১৯০০-২০০০ টাকায় বিক্রি করছে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে একই সিলিন্ডার ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সরেজমিনে গত ১৬ তারিখ মেসার্স এ.আর. ট্রেডার্স নামে একটি খুচরা এলপিজি বিক্রেতার নিকট গিয়ে দেখা যায় পাইকারি বিক্রির সাথে তফাৎ অনেকখানি। খুচরা বিক্রেতা আশিকুর রহমান বলেন, “আমরা পাইকারি থেকে কিনে বিক্রি করি, তাই কিছু বেশি দাম নিতে হয়।”
৩৫ কেজির সিলিন্ডারও ৫৬০০ থেকে ৬২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে- যা সাধারণ ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার উত্থান
গ্যাস সংকটের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ইলেকট্রনিক্স বাজারে। মিরপুরের একটি শোরুমে কথা হয় বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ আরমানের সাথে। তিনি জানান, আগে মাসে ৫টির মতো ইন্ডাকশন চুলা বিক্রি হতো, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ২০-এ দাঁড়িয়েছে। ইনফ্রারেড চুলার বিক্রিও বেড়ে হয়েছে মাসে প্রায় ৩০টির মতো।
“ফেব্রুয়ারি থেকেই বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে,” বলে জানান তিনি। তবে রাইস কুকার ও কারি কুকারের বিক্রি আগের মতোই রয়েছে, কারণ এগুলো আগে থেকেই অনেক পরিবারে ব্যবহৃত হচ্ছে, মত তার।
পরিবর্তিত বাস্তবতা: সংকট না সুযোগ?
গ্যাস সংকটের ফলে একদিকে যেমন ছোট ব্যবসায়ীরা চরম চাপে পড়েছেন, অন্যদিকে বৈদ্যুতিক পণ্যের বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই পরিবর্তন কি টেকসই?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো স্থিতিশীল প্রমাণিত নয়। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য বৈদ্যুতিক চুলা পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়েও উঠতে পারেনি। তাই আপাতত এটি আংশিক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে সমন্বিত নীতিমালা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমাধান জ্বালানি নিরাপত্তায়
এলপিজির বাজারে অস্থিরতা শুধু একটি পণ্যের সংকট নয়- এটি দেশের অর্থনীতি, খাদ্যব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একদিকে বাড়ছে খরচ, অন্যদিকে কমছে আয়। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন পথ খুঁজছে- কেউ কেরোসিনে, কেউ বিদ্যুতে, আবার কেউ খরচ কমানোর কৌশলে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবাই এই জীবন যুদ্ধের সমাপ্তি।
দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সঠিক ব্যবহার এ ক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে বলে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তাদের। তাই গ্যাসের এই সংকট শেষ পর্যন্ত দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন আনবে কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।