সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। সাগরপাড়ের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ চলছিল। ছুটির দিন হলেও কাজে এসেছিলেন শ্রমিকরা। কেউ ছিলেন জাহাজের ভেতরে, কেউ বাইরে। হঠাৎ জাহাজের একটি বদ্ধ অংশ থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত গ্যাস। মুহূর্তেই অচেতন হয়ে পড়েন কয়েকজন শ্রমিক। একজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে আক্রান্ত হন অন্যরাও। শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান নয়জন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ঘটে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা। পুরোনো একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় এর ভেতরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে হতাহতের ঘটনা ঘটে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে ৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করছিলেন।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই মনসুর আহমেদ ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন। অন্যরা হলেন সানি দাস, পলাশ দাস, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন ও ১৭ বছর বয়সী মতিউর রহমান সাজ্জাদ। আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরোনো এলএনজি জাহাজটির ইঞ্জিন রুমের একটি বদ্ধ ট্যাংক বা অংশে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। কাজের একপর্যায়ে সেখানে গ্যাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। দুজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়লে তাঁদের উদ্ধারে অন্যরা এগিয়ে যান। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া বদ্ধ স্থানে প্রবেশ করায় উদ্ধারকারীরাও গ্যাসে আক্রান্ত হন।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কোন ধরনের গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা নিয়মের অংশ।
ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংক বা বদ্ধ অংশে বিষাক্ত গ্যাস থাকার আশঙ্কা থাকে। গ্যাসমুক্ত না করে জাহাজ কাটার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও দুর্বল বলে উল্লেখ করেন।
দুই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর
দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা কতটা দ্রুত শুরু হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুর্ঘটনা ঘটলেও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। অর্থাৎ ঘটনার দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে গিয়ে জাহাজের ভেতর থেকে মরদেহ ও আহত শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। তবে জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি থাকায় উদ্ধারকারীদের জন্যও সেখানে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় আবার উদ্ধার অভিযান চালানোর চেষ্টা করা হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা স্থগিত করা হয়।
নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকেই সতর্কতা
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে এর আগেও নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। ৪ মে পুনরায় পরিদর্শনের পর আগের নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না পাওয়ায় তাগিদ দেওয়া হয়। এরপর ৮ জুন দেওয়া হয় চূড়ান্ত নোটিশ।
নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। এর ঠিক এক মাসের মাথায় একই ইয়ার্ডে নয় শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, মামলা করার পর ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে তদারকি করা হয়েছিল? নিরাপত্তা ঘাটতি দূর না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল কি না? ছুটির দিনে এত শ্রমিককে নিয়ে সেখানে কাজ চলছিল কীভাবে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
শ্রমিক নিরাপত্তায় বড় ঘাটতির অভিযোগ
শ্রমিকনেতা ফজলুর কবির মিন্টুর অভিযোগ, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, এটি মালিকপক্ষের গাফিলতির ফল। ছুটির দিনেও ইয়ার্ডে কাজ চলছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
উন্নয়ন সংস্থা ওয়াইপিএসের অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, জাহাজের বদ্ধ স্থানে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস মিটার দিয়ে পরিবেশ পরীক্ষা করা জরুরি। গ্যাস শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করা হলে শ্রমিক প্রবেশের আগেই বিপজ্জনক গ্যাসের উপস্থিতি জানা সম্ভব হতো।
দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বদ্ধ ও সম্ভাব্য বিষাক্ত পরিবেশে কাজের ক্ষেত্রে গ্যাস শনাক্তকারী যন্ত্র, উপযুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের সরঞ্জাম, সুরক্ষা পোশাক এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা যথাযথভাবে ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই ভাইয়ের মৃত্যু
একই দুর্ঘটনায় দুই ভাই মনসুর আহমেদ ও নাসির উদ্দিনের মৃত্যু ভাটিয়ারী এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই ইয়ার্ডে কাজ করতেন তাঁরা। একজন ছিলেন ফোরম্যান, অন্যজন কাটারম্যান। সংসারের হাল ধরতে বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় কাজ করেছেন দুই ভাই।
কিন্তু কর্মস্থলেই একসঙ্গে তাঁদের মৃত্যু পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইয়ার্ডসংলগ্ন এলাকা।
১৭ বছর বয়সী মতিউর রহমান সাজ্জাদের মৃত্যুও স্থানীয়দের নাড়া দিয়েছে। এত অল্প বয়সে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে তাঁর কাজ করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি শিল্পাঞ্চলে কিশোর শ্রমিকের উপস্থিতি কীভাবে নজর এড়িয়ে গেল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইয়ার্ডে জড়ো হন নিহত ও আহত শ্রমিকদের স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ইয়ার্ডে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনার পর তাঁদের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সংগঠনের কারিগরি উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ দেওয়ার কথা রয়েছে কমিটির।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রমিকদের দেখতে যান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন এবং নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন।
সরকারের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার ব্যয় সরকার বহন করবে বলেও জানানো হয়েছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্সে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
কাগজে কমপ্লায়েন্স, বাস্তবে প্রশ্ন
ফেরদৌস স্টিল ইন্ডিয়ান রেজিস্টার অব শিপিং এবং চলতি বছরের এপ্রিলে ক্লাসএনকে থেকে কমপ্লায়েন্স সনদ পেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অথচ এর মধ্যেই পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি সংস্থার নোটিশ, তাগিদ এবং মামলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন শুধু দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নয়; কাগজে থাকা কমপ্লায়েন্স সনদ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে কোনো ফারাক ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
নয়টি প্রাণহানির এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন সামনে এনেছে—জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা নীতিমালা ও সরকারি নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কতটা কার্যকর।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।