হাম সন্দেহে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যুসহ এক মাস তিন দিনে ২১৩ শিশুর মৃত্যু সবাইকে উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নিপতিত করেছে। এ পর্যন্ত মোট চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৪০৯ জন। বেসরকারি হিসাব মতে, এর সংখ্যা আরও বেশি। হঠাৎ করে হামের এই দুর্যোগ নিয়ে শঙ্কিত সংশ্লিষ্ট সবাই।
বিশেষজ্ঞরা বিগত দুই সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হাম রোগটি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত হলেও পতিত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনার কারণে হামের প্রকোপ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাহিদার অনুপাতে হামের টিকা মজুত না থাকা ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ সংকটের কারণে বিগত কয়েক বছরে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি। জনবল ঘাটতি ও টিকা কর্মসূচিতে যথেষ্ট নজরদারি ছিল না। টিকা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত কর্মীদের মধ্যে ছিল অসন্তোষ। এছাড়া নিয়মিত বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইনও হয়নি। অন্যদিকে হামের রুটিন টিকা কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়নি।
বাদ পড়া শিশুরাই পাঁচ বছরে বড় সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। এসব কারণে মহামারির মতো হাম ছড়িয়ে পড়েছে। ৯ মাসের কম বয়সী শিশু হাম সংক্রমিত হওয়ায় তাদের অভিভাবক-স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার বিগত দুই সরকারের অবহেলা ও অপরিপক্ব পরিকল্পনাকে দায়ী করছে। এছাড়া বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগও খুব বেশি জোরালো উদ্যোগ নেয়নি বলে মনে করছেন তারা।
হামের প্রাদুর্ভাব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীতে আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলনে বলেছেন, ‘বিগত দুই সরকারের গাফিলতিতে হাম ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে।’ তিনি জানান, সময়মতো হামের টিকা না দিয়ে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে দুই সরকার। শিশুমৃত্যুর জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশ করেন।
এর আগে ২৯ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘৮ বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা কর্মসূচি হয়নি। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকার আওতার বাইরে ছিল, তারাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে।’
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা জটিলতায় ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কোনো শিশু হামের টিকা নিতে এসে টিকা না নিয়ে ফেরত যায়নি। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১ এপ্রিল বলেন, ‘এখন দেওয়ার মতো টিকা নেই।’ এর পর ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাচ-আপ টিকাদান শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পর্যাপ্ত হামের টিকা মজুত থাকায় এত স্বল্প সময়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে সক্ষম হয়েছে সরকার।
স্বাস্থ্য সহকারীরা মাঠপর্যায়ে টিকা প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ আমলে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত দাবি করে তারা ২০২৫ সালে বেতন-গ্রেড বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিকেও জিম্মি করে তারা। তখন মাঠপর্যায়ে টিকা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে বলে জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, শনাক্তকৃত হামের রোগীদের মধ্যে ৩৪ থেকে ৬০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শরীরে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড অর্জিত না হওয়ায় হাম হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে মায়েদের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে যথেষ্ট রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তর না হওয়া এবং অপুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতি থেকেও ৯ মাসের কম বয়সী শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)’–এর ‘হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় এ দাবি জানানো হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কোনো রোগের বিস্তার যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন সেটি জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়। বর্তমান সরকার এরই মধ্যে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিলসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতিকে জরুরি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘হাম দ্রুত ছড়ায়। টিকা দেওয়ার পর কার্যকারিতা পেতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রতি হাজারে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক। মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।’
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক শিশু। হাম রোধে নীতিগত সুপারিশ হিসেবে পুষ্টি ও ভিটামিন “এ” কার্যক্রম জোরদার, অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার, মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহিত করা, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং হাম নির্মূল কৌশলপত্র পুনরুজ্জীবন জরুরি। এছাড়া টিকার সরবরাহ ও উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করতে হবে।’
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকাল ৮টা থেকে শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে ৮৬ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৯৪২ জন আক্রান্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪০৯ জন। এ সময় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৭৮ জন। হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৫২২ জন। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৩৫ জন এবং সন্দেহজনক হামে ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।