নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৈশাখী উৎসবে অংশ নিয়েছেন সব বয়সী মানুষ। বৈশাখী মেলা, লাঠিখেলা, বলিখেলা, হা-ডু-ডুসহ ঐতিহ্যবাহী নানা আয়োজনে মুখর ছিল দিনটি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নববর্ষ পালিত হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশে। অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীরা পান্তা ভাত, মাছ, ভর্তা নিয়ে অংশ নেয় সামষ্টিক ভোজে।
তবে এত আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি কাগজপত্রে বাংলা তারিখ উল্লেখ থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
কোথায় এখনও টিকে আছে বাংলা বর্ষপঞ্জি
একসময় কৃষিকাজে বাংলা মাসের হিসাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনও গ্রামাঞ্চলের অনেক কৃষক বৈশাখ, আষাঢ়, কার্তিক বা অগ্রহায়ণ মাস ধরে চাষাবাদ ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণ করেন। আবহাওয়া ও ঋতুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় কৃষিতে বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যবহার এখনো কিছুটা টিকে আছে।
এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিশেষ করে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পহেলা বৈশাখে হালখাতা খোলার রীতি এখনও অনেক দোকানে প্রচলিত রয়েছে।
সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব
সামাজিক ও ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানেও বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রভাব রয়েছে। বিয়ে, গৃহপ্রবেশ কিংবা নতুন কাজ শুরুর ক্ষেত্রে অনেকেই বাংলা মাস বিবেচনায় নেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের বিভিন্ন উৎসব-পার্বণেও বাংলা সন অনুসরণ করে থাকেন।
ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক জীবনযাত্রা, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিনির্ভরতা বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যবহার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বায়তুল্লাহ কাদেরীর মতে, এখন মানুষ বাংলা তারিখ মনে রাখে না। আগে স্কুল-কলেজে বাংলা ও খ্রিষ্টীয় উভয় ক্যালেন্ডার শেখানো হলেও বর্তমানে সেই চর্চা কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে নতুন প্রজন্ম বাংলা মাস ও তারিখ সম্পর্কে আগের মতো জানে না।
ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। পরে এটি ‘বঙ্গাব্দ’ নামে পরিচিতি পায় এবং ধীরে ধীরে বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা বর্ষপঞ্জিকে টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক পর্যায়ে এর চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। নতুবা উৎসবকেন্দ্রিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে এই ঐতিহ্য।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।