সকল মেনু

গলি পেরিয়ে রাজপথ দখল

রাজধানীর সড়কে এক নীরব পরিবর্তন ঘটে গেছে—যেখানে একসময় অটোরিকশা ছিল কেবল অলিগলির পরিবহন, সেখানে এখন তা নির্দ্বিধায় রাজপথ দখল করে ফেলেছে। এই পরিবর্তন শুধু যানবাহনের ধরনে নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল আইন অমান্যের ফল, নাকি এর পেছনে রয়েছে পরিকল্পনার ঘাটতি?

 

প্রথমত, বাস্তবতা হলো—অটোরিকশা একধরনের প্রয়োজনীয়তা থেকে জন্ম নিয়েছে। শহরের ভেতরে স্বল্প দূরত্বে দ্রুত ও তুলনামূলক সস্তা যাতায়াতের চাহিদা পূরণে এই অটোরিকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে তখনই, যখন এই অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ধীরে ধীরে মূল সড়ক দখল করতে শুরু করেছে। অনুমতি ছিল সীমিত এলাকায় চলাচলের, কিন্তু বাস্তবে সেই সীমা মানা হচ্ছে না।

 

এর পেছনে বড় কারণ হলো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব। লাইসেন্সিং নেই, নির্দিষ্ট রুট নেই, চালকদের প্রশিক্ষণ সীমিত—ফলে পুরো খাতটি এক ধরনের ‘অঘোষিত বৈধতা’ নিয়ে চলছে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই।

 

দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ফিডার রোড বা সার্ভিস রোডের অভাবের কারণে অটোরিকশা চালকরা বাধ্য হয়েই মূল সড়কে উঠে আসছে—এমন যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যখন বিকল্প পথ নেই, তখন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এক ধরনের বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে।

 

তৃতীয়ত, নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় অটোরিকশা ও সমজাতীয় যানবাহনের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য। এর কারণ শুধু যানবাহনের গঠনগত দুর্বলতা নয়, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাবও। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চার্জ দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে নগর নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করছে।

 

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব। একসময় নিষিদ্ধ, পরে শিথিল; আবার নতুন মডেল আনার উদ্যোগ—এই দোদুল্যমান অবস্থান সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেয়নি। বরং এতে করে একটি বিশৃঙ্খল বাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে উৎপাদন থেকে পরিচালনা—সবকিছুই চলছে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে।

 

তাহলে সমাধান কী?

 

সমাধান একমাত্র কঠোর নিষেধাজ্ঞা নয়, আবার সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়াও নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি—যেখানে থাকবে নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, এবং প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপদ যানবাহনের মানদণ্ড। একই সঙ্গে বিকল্প অবকাঠামো যেমন ফিডার রোড নিশ্চিত করা জরুরি।

 

সবচেয়ে বড় কথা, এই সমস্যাকে কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি নগর পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান ও জননিরাপত্তার সমন্বিত সংকট। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি।

 

অটোরিকশার দাপট থামাতে প্রশ্নটা শুধু ‘লাগাম টানবে কে’—তা নয়; বরং ‘কীভাবে টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে’—সেই উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top