কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বহুল আলোচিত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ তানজিম ছারোয়ার নির্জন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ডাকাত প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে নিহত এই তরুণ সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (২০ মে) দুপুরে আদালত চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অস্ত্র আইনের পৃথক মামলায় ১৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। একই সঙ্গে পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় ১২ জন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
রায়কে স্বাগত জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বুধবার সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে জোরদার করা হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রিজন ভ্যানে করে আসামিদের আদালতে আনা হয়। পরে একে একে তাঁদের আদালতকক্ষে তোলা হয়।
বেলা ১১টায় শুরু হয় আদালতের কার্যক্রম, যা দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে। পরে আদালত রায় ঘোষণা করেন। আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় ১৩ জনকে অতিরিক্ত ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত ও উপস্থাপিত নথিপত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দি, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক এবং মামলার সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করেই এ রায় দিয়েছেন। বিচারক প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে যতটুকু অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, সে অনুযায়ী সাজা ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের দৃষ্টিতে রায়টি সুস্থ, নিরপেক্ষ ও সন্তোষজনক হয়েছে।
মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে ডাকাতি প্রতিরোধ ও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা পালানোর চেষ্টা করলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন তাঁদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সেনাবাহিনীর ফাঁসিয়াখালী ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ডাকাতি ও হত্যা মামলা করেন। একই ঘটনায় পুলিশের উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন অস্ত্র আইনে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পুলিশ তদন্ত শেষে ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তদন্তে প্রাথমিক এজাহারে থাকা ছয়জনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাঁদের বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন করে আরও সাতজনের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে ডাকাতির প্রস্তুতিসহ হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, দায়িত্ব পালন ও দেশের সেবায় গিয়ে একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তাঁর পরিবার, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র এবং দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও মামলার সার্বিক দিক বিবেচনা করেই বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। সবকিছু পর্যালোচনার পর চারজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী আহসান সেজান বলেন, রায় ঘোষণার পর কাঠগড়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। তবে আসামিদের আচরণে অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, লেফটেন্যান্ট তানজিম ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। মানুষের জানমাল রক্ষা ও আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, আদালত সামাজিক ন্যায়বিচার, জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বিচারক উল্লেখ করেছেন, প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরপরাধ কেউ যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মামলার পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির আইনজীবী তাহসিন সিফাত বলেন, “এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। বিশেষ করে পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অস্ত্র আইনে পৃথক সাজা দেওয়ায় আমরা মনে করছি, তাঁরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।”
মাত্র ২৩ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে তিনি আর্মি সার্ভিস কোরে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।