ইরানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় তিন সপ্তাহ কাটিয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন ১৮৬ জন বাংলাদেশি। তাঁদেরই একজন তেহরানের খাজা নাসির তুসি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন। তেহরান থেকে আজারবাইজান হয়ে ঢাকায় ফেরার পুরো ঘটনাটি ছিল দুঃশ্চিন্তা, আতঙ্ক ও অপেক্ষায় ভরা।
শাকিল জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হয়েছে। পরে জানা যায়, তেহরানের কয়েকটি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হয়েছে। মুহূর্তেই পুরো শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা শিক্ষার্থীদের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। চারদিকে বিস্ফোরণের শব্দ, আকাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া মিসাইল সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল ভীতিকর। নিরাপত্তার জন্য শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেন পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে হলের আন্ডারগ্রাউন্ডে আশ্রয় নেবেন।
এরই মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁরা জরুরি কার্যক্রম চালু রেখেছেন এবং বাংলাদেশিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
পরদিন পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠলে তেহরানে থাকা বাংলাদেশিদের সাভেহ শহরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দূতাবাস। ১ মার্চ রাতে শাকিল ও তাঁর বন্ধু আলী আমিনসহ বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি সেখানে পৌঁছান। একটি হোটেলে দূতাবাসের অস্থায়ী কার্যক্রম শুরু হয়। সেখান থেকেই বাংলাদেশিদের আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শাকিল স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দূতাবাসের কাজে যুক্ত হন। ইরানে থাকা বৈধ ও অবৈধ বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বেশ সময় লাগে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সহায়তায় অবশেষে ১৮৬ জনের জন্য ট্রাভেল পাস প্রস্তুত হয়।
১৯ মার্চ দুপুরে নয়টি বাসে করে সবাই তেহরান থেকে আস্তারা সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে সীমান্তে পৌঁছে নতুন সমস্যার মুখে পড়তে হয়। কাছাকাছি এলাকায় হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ায় সীমান্তের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বা অপেক্ষাকক্ষে রাত কাটান।
পরদিন সকাল থেকে সীমান্ত পারাপারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অবৈধ অভিবাসীদের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র পূরণ করতে হওয়ায় কিছুটা দেরি হয়। আজারি ভাষা জানার কারণে শাকিল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করেন।
শেষ পর্যন্ত সবাই আজারবাইজানে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় বাকু বিমানবন্দরে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিশেষ একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় দলটি। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ২১ মার্চ রাত পৌনে দুইটার দিকে তারা নিরাপদে দেশে পৌঁছান।
যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি পেরিয়ে দেশে ফিরতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করে শাকিল বলেন, “সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল শুধু নিরাপদে দেশে ফিরতে পারলেই হবে। মাতৃভূমিতে পা রাখার পরই যেন সব ভয় দূর হয়ে গেছে।”
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।