সকল মেনু

জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন প্রসিকিউটর!

চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে জামিনের বিনিময়ে এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে। অভিযোগে সরাসরি নাম এসেছে সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। যিনি ফজলে করিম চৌধুরীর মামলার প্রসিকিউটর ছিলেন।

নেত্রা নিউজ ও প্রথম আলোর কাছে পাওয়া একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, সাইমুম রেজা তালুকদার প্রথমে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে বলেছিলেন, জামিন পেতে হলে মোট এক কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে প্রাথমিক ১০ লাখ টাকা আগাম দেওয়া হলে তা “ভালো” হবে।

পরিবারের দাবি, তারা কখনো টাকা দেননি; বরং অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য কথোপকথন রেকর্ড করেছেন। অভিযোগের খবর পেয়ে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তাঁকে মামলার দায়িত্ব থেকে সরান, যদিও তাকে তখনও অন্য কার্যক্রম থেকে সরানো হয়নি।

সাইমুম রেজা তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি সত্য নয়। একক প্রসিকিউটরের পক্ষে জামিন দিতে পারা সম্ভব নয়।’

তিনি পদত্যাগের কারণ হিসেবে শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন এই প্রসিকিউটর।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যে রেকর্ডিংটির কথা বলা হচ্ছে তা যাচাই করার জন্য এবং ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাকে দেওয়া হয়নি। যদি আমাকে দেওয়া হতো, তবে আমি পদক্ষেপ নিতাম। সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেবলমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে আমি কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতাম না। কোনো প্রমাণই পেশ করা হয়নি। এ ছাড়া আমি প্রসিকিউটরদের নিয়োগদানকারী বা অব্যাহতি দেওয়ার কর্তৃপক্ষও ছিলাম না।’

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর আবারও ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে ফোন করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি বলেন, ‘চিফ প্রসিকিউটর বলছিলেন, আমার কাছে অডিও রেকর্ড আছে, এই আছে, সেই আছে। আমি তো একটু অবাক হচ্ছি। হয়তো ব্লাফও (ধোঁকা) দিয়েছে।’ তখন ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে সাইমুম রেজা তালুকদার সতর্ক করে বলেন, যেন তাঁরা তাঁদের ফোনের নিরাপত্তা নিয়ে সাবধানে থাকেন।

ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল প্রযুক্তি আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সাইমুম রেজা তালুকদার সম্ভবত ভেবেছিলেন যে এসব কথোপকথন সরকারি কোনো নজরদারি সংস্থার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছে। ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারই যে তা রেকর্ড করেছে, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। এ ধারণার কারণেই টাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যান তিনি। জোর দেন ফোনের নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। সাইমুম রেজা তালুকদার আবার ফজলে করিম চৌধুরীর মামলায় ফিরে আসেন এবং জামিনের পক্ষে তদবির করার কথা জানান। তবে পরিবারকে তিনি আবারও টাকার বিষয়ে চাপ দিয়েছেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই কয়েকটি কথোপকথনের রেকর্ডিং নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে পাঠায় পরিবার। এর চার দিন আগে ঘুষ দাবির অভিযোগ সম্পর্কে জানাতে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিল পরিবারটি।

এরপর ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের আরেকটি রেকর্ডে সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, মন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনার (স্বজন) সেই অডিও রেকর্ড করে আইনমন্ত্রীকে দিয়ে দিছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি আমাকে একটু হেল্প করতে পারবেন? আইনমন্ত্রী আমাকে এখন মাত্র ফোন করছে, ফোন করে বলতেছে আমাকে পুলিশে দিবে।’

বর্তমান প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ ঘটনার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। আমি কোনো তথ্য পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, মন্ত্রী তাঁকে এ বিষয়ে কিছু বলেননি।

প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, তাঁর জানামতে সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেছেন। কারণ, তিনি শিক্ষকতায় ফিরে যেতে চান।

উল্লেখ্য, ফজলে করিম চৌধুরী ২০২৪ সালের জুলাই হত্যাকাণ্ডের পরে গ্রেপ্তার হন এবং এখনও কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আইসিটিতে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। গতকাল সোমবার সাইমুম রেজা তালুকদার প্রসিকিউটরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top