ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সমঝোতাকে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ‘মাদার অব অল ডিল’ বা ‘সব চুক্তির সেরা চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) নয়াদিল্লিতে ১৬ তম ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এল যখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই অর্থনীতি তাদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোদি জানান, এই চুক্তিটি বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যা উভয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করবে।
এই বিশেষ চুক্তির ফলে ভারতের উৎপাদন এবং পরিষেবা—উভয় খাতই অভূতপূর্ব গতি পাবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ভারতের শ্রমনির্ভর শিল্পগুলো যেমন—তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল, রত্ন ও অলঙ্কার, চামড়াজাত পণ্য এবং সামুদ্রিক খাবার ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে।
বর্তমানে ইউরোপে ভারতীয় পোশাক আমদানিতে প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, যা এই চুক্তির ফলে শূন্যে নেমে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক বাজারে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যের প্রসারে নয়, বরং গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের প্রতি দুই শক্তির যৌথ প্রতিশ্রুতিকেও শক্তিশালী করবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এই চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে একে একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী’ সমঝোতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, যা দুই পক্ষের গভীর কূটনৈতিক সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।
এই চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় দেশগুলো ভারতে তাদের গাড়ি এবং উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাজার সুবিধা পাবে। তবে কৃষি ও ডেইরির মতো সংবেদনশীল খাতগুলোকে আপাতদৃষ্টে এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে বা ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি এই চুক্তিতে পেশাদারদের চলাচলের জন্য একটি ‘মোবিলিটি চ্যাপ্টার’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং গবেষকদের জন্য ইউরোপের দেশগুলোতে কাজ করা এবং স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের ভিসা প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে।
বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল জানিয়েছেন, চুক্তির পাঠ্যটির এখন আইনি পর্যালোচনা বা ‘লিগ্যাল স্ক্রাবিং’ করা হবে এবং আগামী ২০২৭ সালের শুরু থেকে এটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে আরও গতিশীল করার পাশাপাশি ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ভারতকে একটি নিরাপদ ও লাভজনক উৎপাদন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
সূত্র: এনডিটিভি
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।