সকল মেনু

রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দলকে এক করে ফেলেছে ক্ষমতাসীনরা: গোলাম পরওয়ার

রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দলকে এক করে ফেলেছে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা—এমন অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই বিরোধী দলের বক্তব্যকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা চলছে, যা ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ তৈরি করছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দল তিনটি পৃথক বিষয়। সরকারি দল একটি রাজনৈতিক সংগঠন, আর নির্বাচিত সরকার মন্ত্রিসভার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। তাই সরকারের সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়।

তিনি বলেন, সরকারের দুর্নীতি ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বললে সেটিকে রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই তা জুলাই আন্দোলন কিংবা শহীদদের বিরোধিতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সরকার, রাষ্ট্র ও সরকারি দলের পার্থক্য বুঝতে হবে।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা, জনদুর্ভোগের কথা তুলে ধরা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানানো। কিন্তু এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিরোধী দলকে জুলাইয়ের চেতনার বিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিসৌধ স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দল জুলাইকে ধারণ করে না বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু জামায়াত জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে বলেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করছে। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলই জুলাই সনদের চেতনা থেকে সরে যাচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করছে। অন্যদিকে বিএনপি গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। জুলাই আন্দোলনে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ছিল দুর্নীতি, দলীয়করণ ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমান সরকার এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারের সমালোচনা

সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জুলাই সনদে সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দল, বিরোধী দল, বিচার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার সেই চেতনা অনুসরণ করছে না।

সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পিএসসি প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে ক্যাডার নিয়োগের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিদায় করার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়েও বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর দাবি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। জামায়াত পাঁচটি বিষয়ে ভিন্নমত দিলেও বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের স্বার্থে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেনি। তবে বিএনপি সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের পথে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা

ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিসৌধ স্থাপন অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের অনুপস্থিতি নিয়েও কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও আমন্ত্রণপত্রে তাঁর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পদমর্যাদার যথাযথ প্রতিফলন ছিল না। অনুষ্ঠানে তাঁর আসন কোথায় হবে কিংবা তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ারের দাবি, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে সাধারণ দর্শকের আসনে বসতে হলে তা অসম্মানজনক হতো। বিরোধী দলকে ছোট করার উদ্দেশ্যে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ কারণে অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেন জামায়াতের এই নেতা।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়েও সমালোচনা

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের মধ্যে অসংগতি এবং সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তোলেন গোলাম পরওয়ার। দ্রব্যমূল্য, গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ, কেরোসিন, অকটেন ও ডিজেলের দাম বারবার বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা না করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হতো। বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পাশে জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তাঁদের সহায়তা এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় দলের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ওয়াজ মাহফিল, সাংগঠনিক সভা-সম্মেলন এবং আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি বাতিল করে সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন বিষয়েও দলের অবস্থান তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top