দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে ৩৫ বছর পর আবারও জমে উঠেছে রাজনৈতিক লড়াই। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীকে ভোটের লড়াইয়ে দেখা যায়নি। এবার ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে সেই পুরোনো দৃশ্যপট ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সরকারপক্ষের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর প্রথম এবং সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা ও প্রকাশ্য ভোটের বিধানের কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে সাধারণত সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন বলেও দলীয় সূত্রের বরাতে দাবি করা হচ্ছে।
তবে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এমন কোনো বিষয় আমি জানি না। ব্যাপারটি আমার নলেজে নেই।’
দলীয় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিএনপি ইতোমধ্যে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, একই প্রার্থীর নামে একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একটি মনোনয়নপত্রে ত্রুটি থাকলে অন্যটি বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রাখতেই সাধারণত এমনটি করা হয়।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর অলি আহমদ জোটের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি সমগ্র জাতির কাছে কৃতজ্ঞ। ১১-দলীয় ঐক্যজোটের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের সব নেতাকর্মীর কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা বলতে চাই, এই জাতির সঙ্গে আমরা কখনো বেইমানি করব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হারব না জিতব, এটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা হচ্ছে, আমরা জনগণের পাশে সব সময় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য দাঁড়াব।’
অলি আহমদ বলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরীক্ষিত এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই। এসব কারণেই জোটের নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছেন বলে জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট।
একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট চলবে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হিসেবে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা হয়েছে, মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে যদি মাত্র একজন প্রার্থী বৈধ থাকেন, তাহলে নির্বাচনি কর্তা তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করবেন। সে ক্ষেত্রে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না এবং ১৬ আগস্টই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। পাশাপাশি তাঁকে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং অন্য একজনকে সমর্থক হতে হয়। প্রার্থীকেও মনোনয়নপত্রে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করতে হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করার প্রস্তুতি রয়েছে। ২০ আগস্ট সংসদ ভবনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে এ অধিবেশন আহ্বান করা হবে বলে জানা গেছে।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া রাষ্ট্রপতির পদে কে বসছেন, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে জল্পনা, অন্যদিকে বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের নাম ঘোষণায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।