দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আবারও অস্থিরতা ও গভীর তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির শীর্ষ নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন এবং নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আমানতে। মাত্র সাত কার্যদিবসেই ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন আতঙ্কিত গ্রাহকরা।
আমানত প্রত্যাহারের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) যেখানে উদ্বৃত্ত থাকার কথা, সেখানে তা নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক স্তরে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে থাকা ব্যাংকটির চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ব্যালেন্সও মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এই তীব্র সংকট থেকে রক্ষা পেতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি বিশেষ তহবিল বা তারল্য সহায়তা চেয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকিং সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, খুরশীদ আলমের নিয়োগের আগে ইসলামী ব্যাংকের ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উদ্বৃত্ত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকটির সিআরআর লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে টানা গণ-উত্তোলনের ফলে তা বর্তমানে কমে মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
সিআরআর-এর এই ভয়াবহ ঘাটতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে থাকা ব্যাংকটির দৈনিক চলতি হিসাবের ব্যালেন্সও এখন ঘাটতির (নেগেটিভ) দিকে এগোচ্ছে। ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের চাহিদামত টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই তীব্র সংকট থেকে বাঁচতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তার আবেদন করা হয়েছে।
কেন এই অস্থিরতা?
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান আকস্মিক পদত্যাগ করেন এবং একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার এবং গ্রাহকদের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। আন্দোলনকারীরা ইতোমধ্যেই চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে অর্থমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাংশের মতে, খুরশীদ আলমের দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এই সংকট কাটাতে সাহায্য করতে পারে।
আমানত প্রত্যাহারের চাপ
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো বিশাল আমানত ভিত্তির ব্যাংকের জন্য ৪-৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে না। তবে মূল উদ্বেগের জায়গাটি হলো গ্রাহকদের আস্থাহীনতার বার্তাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমানত প্রত্যাহারের এই প্রবণতা যদি আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে এবং মোট উত্তোলনের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে ব্যবস্থাপনা পর্ষদে পরিবর্তন বা বড় ধরনের নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তবে আমানত তোলার এই হিড়িক কতটা বাড়লে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত আসবে, তা নির্ভর করছে নীতিনির্ধারকদের ওপর।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। গ্রাহকদের আতঙ্কিত হয়ে টাকা না তোলার পরামর্শ দিয়েছে আর্থিক খাতের এই নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।
ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রাহকরা আতঙ্কিত হয়ে নগদ অর্থ তুলে নিচ্ছেন, নাকি অন্য কোনো ব্যাংকে তা স্থানান্তর করছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এমন কোনো দেউলিয়া বা সংকটাপন্ন অবস্থায় নেই যে গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা ফেরত দিতে পারবে না। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টেও ব্যাংকটি একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োচিত সহায়তায় তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। এবারও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দেবে।
তবে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অবিলম্বে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোর মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কেবল ধার করা তহবিল দিয়ে দেশের বৃহত্তম এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সংকট স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব নয়।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর খবরে কান দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন।
তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত এবং ব্যাংকে কোনো তারল্য সংকট নেই। গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) সবসময় পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জেরে গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে টাকা তোলার বাড়তি প্রবণতা ও উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় ভিডিও বার্তায় ব্যাংকটির শীর্ষ এই কর্মকর্তা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।