নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণসহ সাতটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
বুধবার (১৩ মে) বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একনেক সভা শেষে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানান, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হবে পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অনুমোদনের পর চলতি বছর থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। প্রথম ধাপের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। পুরো অর্থায়নই আসবে সরকারি তহবিল থেকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে সৃষ্ট পানিসংকট মোকাবিলার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। কয়েক দশকের সমীক্ষা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি অনুমোদনের পর্যায়ে আসে। গত মাসে বর্তমান সরকারের প্রথম একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। এ পানি ব্যবহার করে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীর প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফ-টেক এলাকায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও করা হবে।
এ ছাড়া গড়াই অফ-টেকে ১৫টি স্পিলওয়ে, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চন্দনা অফ-টেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কৃষি ও মৎস্য খাতের উৎপাদন বাড়াতেও এ প্রকল্প ভূমিকা রাখবে। প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং দুই লাখ ৩৪ হাজার টন মাছের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। বাস্তবায়নকালে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জনের জন্য ১২ কোটি ২৫ লাখ জন-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। এর আওতায় চার বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলা রয়েছে। তবে প্রথম ধাপে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপকারভোগী জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুর।
দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।
পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন বিএনপি সরকার এ উদ্যোগ নেয়। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শকদের একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে সেই সমীক্ষা সম্পন্ন করে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।