৭ মে ২০২৫, সেদিন আমল সোবেইহের কোলে এল ছোট্ট সানা। আর সেদিনই তাঁর স্বামী ইয়াহিয়া সোবেইহ চলে গেলেন, চিরতরে। ইয়াহিয়া ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক। মেয়ের জন্মের পর হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টা কাটালেন — শিশুকে বুকে নিলেন, কানে আজান দিলেন, ছবি তুললেন, আনন্দ ভাগ করলেন আত্মীয়দের সঙ্গে। তারপর বললেন, মিষ্টি বিতরণ করে দ্রুত ফিরবেন। আমলকে বললেন, বিশ্রাম নাও — মেয়ের নাম একসঙ্গে রাখব।
সে সুযোগ আর এল না। গাজা সিটির একটি বাণিজ্যিক এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৭ জনসহ নিহত হলেন ইয়াহিয়া। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শ্যালক — যারা ঘণ্টা কয়েক আগে একই হাসপাতালে নবজাতককে কোলে নিয়েছিলেন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সার্জারির পর সুস্থ হতে থাকা আমল বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা হয়েছে — চারদিকে ফিসফাস, চেহারায় ভয়। ইয়াহিয়াকে পনেরো বারেরও বেশি ফোন করলেন। কেউ তোলেনি। ফোনেই খবরের শিরোনাম দেখলেন: “সাংবাদিক ইয়াহিয়া সোবেইহ নিহত, মেয়ের জন্মের মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পর।”
এক বছর পরে, ছোট্ট সানার প্রথম জন্মদিন। আমল একটা ছোট কেক বানিয়েছেন, কিছু মিষ্টি রেখেছেন। পাশে স্বামীর ছবি। বলছেন, “ইয়াহিয়া থাকলে উৎসব করতেন। সানার কোনো দোষ নেই।” তবে সেই প্রশ্নটা তাঁর মনে থেকে যাচ্ছে — কোনো একদিন এই মেয়েকে কীভাবে বলবেন যে, যে দিনটা তার জন্মের দিন, সেটাই বাবাকে হারানোর দিন?
ইতিহাসের রেকর্ড
এই যুদ্ধ সাংবাদিকদের জন্য মানবেতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ
ইরাক যুদ্ধ, ভিয়েতনাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ — ইতিহাসের কোনো সংঘাত এত সাংবাদিকের প্রাণ নেয়নি এত অল্প সময়ে। CPJ-এর তথ্যমতে, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত গাজা, লেবানন, ইয়েমেন ও ইরানে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ২৬২ জন সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬৯ জনই ফিলিস্তিনি, জাতিসংঘের হিসেবে।
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ১২৪ জন সাংবাদিক নিহত হন — যা ২০০৭ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়কার রেকর্ড ১১৩ জনকেও ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০২৫ সালে সেই রেকর্ড আবার ভাঙে: নিহত হন ১২৯ জন। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই ইসরায়েলের হামলায়। CPJ প্রধান জোডি গিন্সবার্গ বলেছেন, “আজকের দিনটি CPJ-এর ইতিহাসে সাংবাদিক হওয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়।”
CPJ-এর ডেটা আরও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখাচ্ছে — ড্রোন হামলা। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ড্রোনে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ৪,০০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালে ড্রোনে নিহত ৩৯ জন সাংবাদিকের মধ্যে ২৮ জনই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় গাজায় মারা গেছেন।
কিছু হারিয়ে যাওয়া মুখঃ
গ্রেপ্তার ও নির্যাতন
যাদের হত্যা করা হয়নি, তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। CPJ অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৯৪ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিকের গ্রেপ্তারের তথ্য নথিভুক্ত করেছে — ৩২ জন গাজা থেকে, ৬০ জন ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ৩০ জন এখনও আটক।
CPJ মুক্তি পাওয়া ৫৯ জন সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৮ জন বলেছেন কারাগারে তাদের নির্যাতন করা হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক: ৪৮ জনকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল — “অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন” নামের একটি ব্যবস্থায়, যেখানে প্রতি ছয় মাসে আদেশ নবায়ন করে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা যায়।
Screenshot 2026-05-07 200650
CPJ-এর রিপোর্টে উঠে আসা নির্যাতনের বিবরণগুলো একে অপরের সঙ্গে ভীতিকরভাবে মিলে যায় — যেন একটাই পদ্ধতি, একাধিক কারাগারে প্রয়োগ হচ্ছে।
“সন্ত্রাসী” বলে ট্যাগ দেওয়া — তারপর হত্যা করা
ইসরায়েল একটি নির্দিষ্ট কৌশল বারবার ব্যবহার করছে: সাংবাদিককে হত্যার আগে বা পরে তাঁকে “হামাস সদস্য” বা “সন্ত্রাসী” বলে চিহ্নিত করা। আগস্ট ২০২৫ সালে ইসরায়েলি প্রকাশনা +972 ম্যাগাজিন জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একটি বিশেষ ইউনিট “লেজিটিমাইজেশন সেল” তৈরি করেছে, যার কাজ হলো ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের হামাসের সঙ্গে যুক্ত করার তথ্য খোঁজা — যাতে তাদের হত্যাকে ন্যায্য দেখানো যায়।
হোসাম শাবাতকে মাসের পর মাস ধরে “সন্দেহজনক” বলে চিহ্নিত করা হচ্ছিল — তারপর তাঁকে মারা হয়েছে। ইসমাইল আল-গুলকে “হামাসের পদমর্যাদা” দেওয়া হয়েছিল ১০ বছর বয়সে, এই নথি দিয়ে হত্যার ন্যায্যতা দেওয়া হয়। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সাংবাদিক যদি সশস্ত্র সংঘর্ষে সরাসরি অংশ না নেন, তাহলে তাঁকে হামাস-সংশ্লিষ্ট হলেও হত্যা করা যুদ্ধাপরাধ।
তথ্যের শূন্যতা
বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি — সংবাদের দরজা বন্ধ
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রবেশ করতে দেয়নি। ফলে যা কিছু দেখা গেছে, তা মূলত স্থানীয় ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের কাজ। এই তথ্যশূন্যতার সুযোগেই অনেক নৃশংসতা বিশ্বের সামনে আসতে পারেনি সময়মতো।
সিপিজে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে আইনি আবেদন করেছে গাজায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের জন্য। AFP জুলাই ২০২৫ সালে সতর্কবার্তা দিয়েছে — তাদের গাজার একজন সাংবাদিক শারীরিকভাবে কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন, কারণ তিনি ক্ষুধায় শেষ হয়ে গেছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদ সংস্থার একজন সাংবাদিক যুদ্ধের মাঠে না — ক্ষুধায় মরছেন।
জবাবদিহিতা
কেউ বিচারের মুখোমুখি হয়নি — এবং এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা
সিপিজে বারবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে নিহত সাংবাদিকদের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। প্রতিবারই হয় কোনো উত্তর আসেনি, অথবা এসেছে একই ধরনের দাবি ‘তারা সন্ত্রাসী ছিল।’ আইডিএফ বলে, ‘আমরা সাংবাদিক হওয়ার কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করি না।’ কিন্তু ৯৪ জন সাংবাদিকের মধ্যে ৪৮ জনকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখার ব্যাখ্যা দেয়নি ইসরায়েলী বাহিনী।
সিপিজে-এর ভাষায়, ‘ইসরায়েল যতজন সাংবাদিককে হত্যা করেছে, তা ১৯৯২ সাল থেকে সিপিজে-এর রেকর্ড করা যেকোনো সরকারের চেয়ে বেশি — এবং এক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি সম্পূর্ণ।’ সারা কুদাহ বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাই এই পরিস্থিতিকে সম্ভব করে তুলছে।’
আমল সোবেইহ এখন নিজেই সাংবাদিক — স্বামীর পথে হেঁটে
শেষে আবার ফেরা যাক আমলের কাছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একা তিন সন্তান নিয়ে দক্ষিণ গাজায় সরে গেছেন, তাঁবুতে থেকেছেন, ভেঙে পড়েছেন। কিন্তু শেষমেশ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন — ইয়াহিয়ার পথে হাঁটবেন। যে মিডিয়া হাউসে তাঁর স্বামী কাজ করতেন, সেখানে যোগ দিয়েছেন।
তিনি বলছেন, “আমি চেষ্টা করছি তাঁর বার্তা বহন করতে। নিজের জন্য এবং আমার ছেলেমেয়েদের জন্য শক্ত থাকতে।” ছোট্ট সানা এখন বছরে পড়েছে — হাঁটতে শিখছে, হাসছে। মায়ের কান্নায় এগিয়ে আসে, জড়িয়ে ধরে। যেন সে বোঝে।
গাজায় ২৬২ জনেরও বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার আছে। প্রতিটি গ্রেপ্তারের পেছনে একটি গল্প আছে। আর প্রতিটি নীরবতার পেছনে আছে একটি দায়মুক্তি — যা পৃথিবীকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে সাংবাদিকদের জন্য, সর্বত্র।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।