সকল মেনু

কোটিপতি প্রার্থীতে বিএনপি জোটের আধিপত্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণ করে আর্থিক অবস্থার এক তুলনামূলক চিত্র বেরিয়ে এসেছে। যাতে দেখা যায়, সম্পদের দিক দিয়ে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের থেকে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি জোট সংরক্ষিত আসনে মোট ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬ জনই কোটিপতি। অন্যদিকে সম্পদের বিচারে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র একজন প্রার্থী কোটিপতি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেছেন।

সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বৈধ বলে বিবেচিত ৪৯ প্রার্থীর সম্পদের তারতম্য থাকলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক দিয়ে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীরা প্রায় সমানে সমান। বিএনপি জোটের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন আইনজীবী ও একজন চিকিৎসক। অন্যদিকে জামায়াত জোটের ১২ জনের মধ্যে তিনজন শিক্ষক, দুজন আইনজীবী ও একজন চিকিৎসক রয়েছেন।

বিএনপি জোটের ৩৩ প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও জামায়াত জোটের কারও বিরুদ্ধেই কোনো মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। স্বতন্ত্র জোটের একমাত্র প্রার্থী সুলতানা জেসমিন জুঁই এর সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ২৮ লাখ টাকা। তাঁর বার্ষিক আয় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা পাঁচটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

হলফনামা অনুযায়ী বিএনপি জোটের ১৬ জন কোটিপতি প্রার্থী আছেন। তারা হলেন- সেলিমা রহমান, শিরীন সুলতানা, নিপুণ রায় চৌধুরী, শওকত আরা আক্তার, হেলেন জেরিন খান, ফাহিমা নাসরিন, রাশেদা বেগম হিরা, সুলতানা আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, ফেরদৌসী আহমেদ, সাবিরা সুলতানা, শামীম আরা বেগম স্বপ্না, আন্না মিন্জ, সানজিদা ইসলাম তুলি, মাহমুদা হাবীবা এবং নেওয়াজ হালিমা আরলী। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সম্পদের পরিমাণ দুই থেকে ছয় কোটি টাকার মধ্যে। অন্যদিকে জামায়াত জোটের একমাত্র কোটিপতি প্রার্থী জামায়াতের মহিলা বিভাগের আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সাবিকুন্নাহার মুন্নী।

এ দিকে কোটিপতি প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী। তাঁর রয়েছে সাড়ে ১০ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ ও ব্যক্তিগত মালিকানায় ৫০২ ভরি স্বর্ণ। এর বাইরে তাঁর স্বামী অমিতাভ রায়ের নামে রয়েছে আরও ১০০ ভরি গহনা। এই দম্পতি ৬০২ ভরি স্বর্ণালংকারের মালিক, যার অর্জনকালীন মূল্য জানা না থাকলেও এগুলো উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়।

পেশায় আইনজীবী নিপুণ রায়ের বছরে আয় ২৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া শেয়ার ও ব্যাংক আমানত থেকে বছরে আরও প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা আয় করেন। নিপুণ রায়ের নামে ১ কোটি ১৩ লাখ ২১ হাজার টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। তাঁর নামে থাকা দুটি গাড়ির ক্রয়মূল্য ১ কোটি ১১ লাখ টাকা। তাঁর নিজের নামে থাকা অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর স্বামীর নামে অস্থাবর সম্পদের মূল্য সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৮৫ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। নিপুণ রায়ের নামে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকার ব্যাংকঋণ ও ব্যক্তিগত দায় রয়েছে। স্বামী ও স্ত্রী মিলিয়ে তাঁদের কাছে নগদ অর্থ রয়েছে মোট ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিপুণ রায়ের নিজের নামে রয়েছে ১৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

 

হলফনামা ঘেঁটে যা পাওয়া গেল

বেগম সেলিমা রহমান: ৮৫ বছর বয়সী এম এ পাস করা বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তার নামে মামলা ছিল ৮টি, গেল বছর নির্বাহী আদেশে প্রত্যাহার হয় সব মামলা। ৩৬ লাখ টাকার বেশি বার্ষিক আয়; বাড়ি ভাড়া, শেয়ার ও ব্যাংক আমানত থেকে আসে এই অর্থ। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার ৭৩৭ টাকা।

শিরীন সুলতানা: ৫৯ বছর বয়সী এমএসএস পাস করা এই সংসদ সদস্য ১৯৯৬ সালেও সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তার ১০টি মামলা বিচারাধীন, আগে ৮টি মামলায় খালাস পান তিনি। তার বার্ষিক আয় ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। সম্পদ রয়েছে চার কোটি সাড়ে ছয় লাখ টাকার বেশি।

রাশেদা বেগম হীরা: বয়স ৬৯ বছর বয়সী এমফিল করা এই সংসদ সদস্যর নামে একটি মামলা ছিল। ২০২৪ সালে খালাস পেয়েছেন। আয়কর রিটার্নে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২৫ লাখ টাকার বেশি। দেড় কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন তিনি। অষ্টম ও নবম সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।

নেওয়াজ হালিমা আরলী: ৫৭ বছর বয়সী এমএ পাশ করা এই সদস্য অষ্টম সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ছিলেন। মামলা ছিল একটি, প্রত্যাহার হয়েছে ২০২৪ সালে। এই আইনজীবীর বার্ষিক আয় ১৪ লাখ লাখ টাকার বেশি; সম্পদ রয়েছে দেড় কোটি টাকার।

হেলেন জেরিন খান: ৫৭ বছর বয়সী হেলেন জেরিন খান অষ্টম সংসদের নারী আসনের সদস্য ছিলেন। এম এ ও এলএলবি পাস করা এ রাজনীতিকের ১১টি মামলা ছিল, সবকটি থেকে অব্যাহতি পান তিনি। বার্ষিক আয় ৩৭ লাখ টাকার বেশি, আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখানো হয়েছে ৬ কোটি টাকার বেশি।

মাহমুদা হাবীবা: ৫৩ বছর বয়সী মাহমুদা হাবীবা বিকম পাস করেছেন। কোনো মামলা নেই। বার্ষিক আয় ৬ লাখ টাকা আর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার।

মোছা. সাবিরা সুলতানা: ৫০ বছর বয়সী মোছা. সাবিরা সুলতানা উচ্চ মাধ্যমিক করেছেন। দুটো মামলা চলমান আর ৮টি মামলা খালাস হয়েছে। ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকা আর সম্পদ ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

সানজিদা ইসলাম তুলি: ৪৩ বছর বয়সী সানজিদা ইসলাম টেক্সটাইলে বিএসসি করেছেন। কোনো মামলা নেই। বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা আর সম্পদ দেখিয়েছেন ২ কোটি ১৩ লাখ টাকার বেশি।

সুলতানা আহমেদ: ৬২ বছর বয়সী সুলতানা আহমেদ করেছেন এলএলবি। ৫টি মামলা খালাস রয়েছে। বার্ষিক আয় ৯৬ লাখ টাকা আর রিটার্নে সম্পদ দেখানো হয়েছে সাড়ে ৫ কোটি টাকার।

আন্না মিনজ: ৬৪ বছর বয়সী আন্না মিনজ পড়েছেন এমএসসি পর্যন্ত। তিনি বার্ষিক আয় করেন ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৮ লাখ টাকার।

শামীম আরা বেগম স্বপ্না: ৬৬ বছর বয়সী শামীম আরা বেগম স্বপ্না এমএসসি করেছেন। দুটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। চলতি অর্থবছরে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয়; এরমধ্যে জমি বিক্রি হতে মূলধনী আয় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর তার সম্পদ রয়েছে ৪ কোটি টাকার।

ফেরদৌসী আহমেদ: ৫২ বছর বয়সী ফেরদৌসী আহমেদ স্নাতক পাস। ৭টি মামলায় এজহারে অভিযুক্ত। আয় ৪ লাখ ৯১ হাজার, সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকার।

বীথিকা বিনতে হোসাইন: ৪৬ বছর বয়সী বীথিকা বিনতে হোসাইন এমএ করেছেন। বার্ষিক আয় ৩৮ লাখ টাকা, সম্পদ রয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

ফাহিমা নাসরিন: ৬৩ বছর বয়সী ফাহিমা নাসরিন এমএ পাস। দুটি মামলার একটি স্থগিত ও অন্যটি থেকে অব্যাহতি। বার্ষিক আয় ১১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আর সম্পদ ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

শওকত আরা আক্তার: ৪৯ বছর বয়সী শওকত আরা আক্তার করেছেন এলএলএম। বার্ষিক আয় প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করেন আর সম্পদ রয়েছে ২ কোটি টাকার।

এছাড়া জামায়াত জোটের প্রার্থী ৫৩ বছর বয়সী এমএসএস পাস করা সাবিকুন্নাহার মুন্নী। বার্ষিক আয় আয় ১৬ লাখ টাকা আর সম্পদ ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকার।

এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৫৩ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার বাছাইকালে বিএনপি জোটের ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে সবার এবং স্বতন্ত্র জোটের একমাত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। জামায়াত জোটের ১৩ প্রার্থীর মধ্যে ১২ জনের বৈধ ও একজনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো দল বা জোটের পরিচয় এবং প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষর না থাকায় অন্য তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছে ইসি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top