প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বিএনপির ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন ১১ দলের নেতারা।
বুধবার (২২ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে খেলাফত মজলিস কর্তৃক আয়োজিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আমাদের করণীয় শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এগারো দলের শীর্ষ নেতারা পৃথক বক্তব্যে সংস্কার প্রক্রিয়া, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত সংস্কার কোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে নয়; বরং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, ক্ষমতায় এসে কেউ যেন ইচ্ছামতো অন্যায় করতে না পারে—এটাই সংস্কারের মূল লক্ষ্য। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগের দাবি জানান এবং এ জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এসব সংস্কার গ্রহণ করলে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের আশপাশে থাকা কিছু “দুষ্টচক্র” ভুল পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এছাড়া সংসদের মান নিয়েও সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেক সদস্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন।
কর্নেল অলি আরও জানান, ১১ দলীয় জোট ধাপে ধাপে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে—প্রথমে বিভাগীয়, পরে জেলা এবং সর্বশেষ সারা দেশে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অতীতের মতো বড় ধরনের গণআন্দোলন দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পথে সরকারই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, বর্তমান সংকট তৈরি করেছে বিএনপি, তাই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই তাদের এ সংকটের সমাধান করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে দেওয়া কিছু মন্তব্যকে তিনি অনুচিত ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেন।
পরোয়ার দাবি করেন, ঐকমত্য কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে অধিকাংশ বিষয়ে বিএনপি একমত হলেও গুরুত্বপূর্ণ ১০টি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে এখন বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ মানে ভিন্নমত রেকর্ড করা—এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করার সুযোগ নয়।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় ৫ কোটি মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন, যা বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের চেয়েও বেশি। তাই গণভোটের ফলাফলই জনগণের প্রকৃত অভিপ্রায় প্রতিফলিত করে। তিনি আরও বলেন, ব্যালটে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উল্লেখ না থাকায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানেই সংস্কার মেনে নেওয়া—এখন তা অস্বীকার করা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। সতর্ক করে তিনি বলেন, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে যেতে পারে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের বাচ্চু বলেন, বিএনপি একদিকে গণভোটকে অবৈধ বলছে, অন্যদিকে বাস্তবে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ এতে অংশ নিয়ে সমর্থন দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর এখন কেন বিএনপি গণভোটকে “প্রতারণা” বলছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি জনগণের স্বার্থে করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল করেছে—যার মধ্যে বিচারপতি নিয়োগ পদ্ধতি ও প্রশাসনিক সংস্কারও রয়েছে। তার দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দলটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের পথে এগোচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে অন্য দলের সমালোচনা করলেও এখন বিএনপি একই পথ অনুসরণ করছে। তিনি সতর্ক করেন, জনবিরোধী অবস্থান থেকে বিএনপি সরে না এলে ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের জনগণ এখন সচেতন—তাদের বিভ্রান্ত করা সহজ হবে না।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।