সকল মেনু

নতুন বছরে নতুন স্বপ্ন: দিন বদলের প্রত্যাশা দেশের মানুষের

পয়লা বৈশাখ ১৪৩৩। নতুন সূর্যের আলোয় আবারও জেগে উঠেছে বাঙালির প্রাণ। এবারের প্রতিপাদ্য—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। এটি শুধু একটি স্লোগান নয়; সময়ের দাবি, মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বপ্নের প্রতিফলন।

পুরোনো বছরের গ্লানি, হতাশা ও ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নতুন দিনের প্রত্যাশায় মুখর হয়ে ওঠে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই নতুন সূচনার আশায় বুক বাঁধেন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ নানা পেশার মানুষ। সবার প্রত্যাশা, নতুন বছর বয়ে আনবে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।

বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। গ্রামে চিরায়ত ঐতিহ্যের রূপ ফুটে ওঠে, শহরে যোগ হয় আধুনিকতার ছোঁয়া। পান্তা-ইলিশ, পিঠাপুলি ও নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারে ভরে ওঠে ঘর। লাল-সাদা পোশাকে সেজে ওঠেন নারী-পুরুষ; শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই। শোভাযাত্রা, মেলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও লোকজ সংগীতের আসর নতুন বছরকে বরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, ভাটিয়ালি গানের সুরে ভেসে আসে বাংলার মাটি ও মানুষের গল্প। এসব আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, বরং হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিতকে আরও দৃঢ় করে।

নতুন বছর ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও ভিন্ন ভিন্ন। এক রিকশাচালক বলেন, নতুন বছরে তার সবচেয়ে বড় আশা—প্রতিদিন যেন ভালো ভাড়া পান। যাত্রী বাড়লে আয় বাড়বে, সংসার চালানো সহজ হবে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমার প্রত্যাশাও জানান তিনি। তার ভাষায়, আয় কম হলেও খরচ সব সময় বাড়তেই থাকে। স্ত্রী-সন্তান সুস্থ থাকুক, সন্তানের মুখে হাসি ফুটুক—এটাই তার বড় স্বপ্ন। সন্তানদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেটিও তার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, তার গত বছর ভালো কেটেছে। নতুন বছরটিও যেন সাফল্য ও সমৃদ্ধিতে কাটে—এটাই তার প্রত্যাশা। পাশাপাশি তিনি সমাজে অনৈতিকতা ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকার আহ্বান জানান।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, গত বছরে অনেক কিছু না চাইতেও পেয়েছেন, আবার কিছু জিনিস হারিয়েছেন। নতুন বছরে তিনি সব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে চান এবং পড়াশোনার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে চান।

রাজধানীর পল্টনের মুদি দোকানি রহিম উদ্দিন বলেন, বছরের অন্য সময়ের মতো এই সময়েও আমার দোকান খোলা থাকে, তবে পয়লা বৈশাখের দিনটির গুরুত্ব আলাদা। এদিনই হয় ‘হালখাতা’—পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খোলা। সকাল থেকেই দোকানে তৈরি হয় ভিন্ন আমেজ। লাল-সাদা সাজ, নতুন খাতা আর ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে পরিবেশ। পুরোনো ক্রেতারা এসে বকেয়া পরিশোধ করেন, মিষ্টিমুখ করেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

তিনি আরও বলেন, নতুন বছরে তার ব্যবসার উন্নতি হবে—বিক্রি বাড়বে, লাভ বাড়বে—এটাই তার আশা। বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়েরই স্বস্তি থাকবে। পাশাপাশি দেনা-পাওনার ঝামেলা কমে আসার প্রত্যাশাও জানান তিনি।

গুলিস্তানের এক হকার বলেন, দৈনন্দিন খরচ ও সন্তানের পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারাই তার বড় চাওয়া। তিনি নিরাপদে ব্যবসা করার পরিবেশ চান। উচ্ছেদ অভিযান, চাঁদাবাজি বা পুলিশের ঝামেলা যেন কমে—এটাই নতুন বছরের প্রত্যাশা।

সাংস্কৃতিক কর্মী শরিফ হোসেন বলেন, জুলাইয়ের পর একটি নতুন সমাজ গড়ে উঠেছিল, সেখান থেকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মতে, দেশ দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের মধ্যে বন্দী ছিল, ফলে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তিনি আশা করেন, নতুন সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি তিনি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানান।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় মানুষের মৌলিক অধিকার ছিল না, সাংস্কৃতিক আয়োজনও হয়নি। এখন সেই পরিবেশ ফিরে আসায় তিনি সন্তুষ্ট এবং এটি অব্যাহত থাকুক—এটাই তার প্রত্যাশা।

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নতুন বছরকে বরণ করেছে। আয়োজকরা বলছেন, বাংলা নববর্ষ মনে করিয়ে দেয়—ঐক্যের শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি। ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে এগিয়ে গেলে একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top