কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে একটি দরবার বা আস্তানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় ওই দরবারের কথিত প্রধান পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফে’ এই ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে।
হামলায় আরও দুজন আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
তার দাবি, তিন বছর আগের একটি ভিডিওর সূত্র ধরে কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে দুপুরের দিকে স্থানীয় একদল লোক একত্রিত হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। পরে আহত অবস্থায় তিনজনকে দৌলতপুরের থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে নেওয়া হয়।
সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক জানিয়েছে, আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আব্দুর রহমান ওরফে শামীম।
হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার কিছু ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ভিডিওকে কেন্দ্র করে শনিবার দুপুরের দিকে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে দরবারটি ঘেরাও করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
স্থানীয় সাংবাদিক আহমেদ রাজু জানান, ‘দুপুর একটার দিকে লোকজন জড়ো হয়ে দরবারটি ঘিরে ফেলে। পরে তারা লাঠিসোটা নিয়ে ভেতরে ঢুকে হামলা চালায়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, শত শত মানুষ দরবারে ঢুকে ভাঙচুর চালাচ্ছে। পরে বিভিন্ন কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
হামলার সময় দরবারের ভেতরে শামীম ও তার দুই অনুসারী ছিলেন। হামলাকারীরা তাদের মারধর করে গুরুতর আহত করে।
পুলিশ জানায়, দুপুর থেকে প্রায় পৌনে তিনটা পর্যন্ত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা চলে।
এ সময় আহত তিনজনকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে শামীম মারা যান।
হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য দুইজন বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
পুলিশ ও পরিবার যা বলছে
ওই দরবার এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। স্থানীয় সাংবাদিক আহমেদ রাজু বলেন, ‘পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতিতেও সেখানে দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।’
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘সন্ধ্যায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। আমরা সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি।’
তিনি বলেন, ‘সেখানে সবাই ছিল স্থানীয়। তারা প্রচণ্ড আক্রশ নিয়ে কাজটি করেছে। কোরআন নিয়ে কথাবার্তা বলেছে সে কারণে স্থানীয়রা খুব ক্ষুব্ধ ছিল।’
তবে তিনি জানান, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে নিহত শামীমের পরিবার জানিয়েছে এই ঘটনায় তারা মামলা করতে চাচ্ছে না।
নিহতের বড় ভাই গোলাম রহমান বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারতেছি না আসলে কী করবো। আমার ভাই মারা গেছে। আপাতত এতটুকুই। আমরা খুব নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না বলে মামলাও করতে চাই না।’
তবে ঠিক কী কারণে মামলায় আগ্রহী নন সেটি তিনি বলতে চাননি।
শামীমের বিরুদ্ধে ২০২১ সালেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠেছিল এবং বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ছিল বলে জানান দৌলতপুর থানার ওসি (তদন্ত) শেখ মোহাম্মদ আলী মোর্তুজা। তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমি এই থানায় ছিলাম না। তবে আমরা শুনেছি সে তিন মাস জেল খেটেছিল তখন।’
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।