আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর ঢাকা-১৮ সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপের মধ্যেই জামায়াত–এনসিপি জোটের ১১ দলীয় জোট প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। দফায় দফায় তার নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগের মধ্যেই সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে খিলক্ষেত এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে জোটের একাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
সোমবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ডুমনি নূরপাড়া এলাকায় একটি মাদরাসা ও এতিমখানা পরিদর্শন এবং গণসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নেন আরিফুল ইসলাম আদীব। এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদার মোল্লার নেতৃত্বে একদল লোক তার ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছে জোট সংশ্লিষ্টরা। হামলায় অন্তত ৯ জন আহত হন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে মাদরাসার সুপারের ভাইও রয়েছেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, “সকালে নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে ঢাকা-১৮ আসনের জামায়াত–এনসিপি জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের লোকজন হামলা চালিয়েছে। এতে আমাদের কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, সোমবার বিকেল ৪টায় উত্তরা আজিমপুর মসজিদ থেকে শহীদ মুগ্ধ মঞ্চ পর্যন্ত ১১ দলীয় জোটের ‘আজাদী যাত্রা’ কর্মসূচি পূর্বনির্ধারিত ছিল। কিন্তু এর আগের রাতে বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন পালটা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। “এরপরই সকালে এই হামলার ঘটনা ঘটে। আমরা দুপুর সাড়ে ১২টায় সংবাদ সম্মেলন ঘোষণা করলে তার আশপাশের এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা শোডাউন দেয়,” যোগ করেন তিনি।
ঢাকা-১৮ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রচার বিভাগের প্রধান কামরুল হাসান ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, খিলক্ষেতের দুমনি ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের নূরপাড়া মাদরাসায় একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন আরিফ আদীব। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিএনপির স্থানীয় নেতা দিদার মোল্লার নেতৃত্বে হামলা হয়। এতে আমাদের ৯ জন কর্মী আহত হয়েছেন। দুইজনের অবস্থা গুরুতর। বর্তমানে সেখানে হামলার প্রতিবাদে কর্মসূচি চলছে।
জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, এটি প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও শনিবার ও রোববার নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারী কর্মীদের হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এটি কোনোভাবেই হওয়ার কথা নয়। আমাদের কেউ কারও ওপর হামলা করার কথা নয়। বিষয়টি এখনো আমি শুনিনি।
এদিকে আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতাকর্মীরা নিয়মিতভাবে জোটের নির্বাচনী কার্যক্রমে বাধা দিয়ে আসছে। গত কয়েক দিনে আবদুল্লাহপুরে এক জামায়াত কর্মীর ওপর হামলা, খিলক্ষেত বরুয়া এলাকায় নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনে বাধা, তুরাগের বামনারটেকে ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা এবং নিকুঞ্জ এলাকায় নারী কর্মীদের হুমকি দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব বিষয় নিয়ে এর আগে এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
অথচ তার পরদিনই এই ন্যাক্কারজনক হামলা সংঘটিত হলো, দাবি এনসিপির।
দলের বিবৃতিতে ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সহিংসতার অভিযোগও তোলা হয়। এতে বলা হয়, একজন এমপি প্রার্থীর ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ ও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এনসিপি দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দলটি বলেছে, সহিংসতার রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণ ভোটের মাধ্যমেই উপযুক্ত জবাব দেবে।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, আমরা ঘটনার আকস্মিকতায় নিজেরাই অবাক হয়েছি। তারেক জিয়ার গুন্ডা বাহিনী রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ভয়াবহ হামলা করেছে আমাদের এনসিপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের নির্বাচনী প্রচারণায়।
তিনি বলেন, এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিএনএসে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়েছিল। তার আগেই এ জায়গায় বিএনপি জাহাঙ্গীরের সন্ত্রাসী নেতাকর্মীরা ফের হামলা করতে আসে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপিকে অবশ্যই তাদের সন্ত্রাসীদের থামাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ঘটনায় যদি পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়, তবে আদতে কারও ভালো হবে না।
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারের সময় পরিকল্পিত হামলা প্রমাণ করে দেশে গণতন্ত্র ও সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ কতটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ঘটনার পর ঢাকা-১৮ আসনে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ১১ দলের প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।