বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তার মৃত্যুর খবর জানানো হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং ক্ষমতার পালাবদলের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল তার নাম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে।
জন্ম ও পরিবার
বিএনপির ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থের তথ্যে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম সাল ১৯৪৬। তবে ‘নন্দিত নেত্রী: খালেদা জিয়া’ গ্রন্থে তার উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমেদ উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ির নয়াবস্তি এলাকায় তার জন্ম। সেই ভোরের কথা স্মরণ করে তিনি লেখেন—শরতের স্নিগ্ধ সকালে নতুন শিশুর আগমনে পরিবারে নেমে আসে আনন্দ।
খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম ছিল খালেদা খানম। ডাকনাম পুতুল। পারিবারিক পরিমণ্ডলে তাকে টিপসি ও শান্তি নামেও ডাকা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে শান্তির আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটেই সদ্যজাত কন্যার নাম ‘শান্তি’ হয়ে ওঠে বলে জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
তার আদিবাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ও মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। দুই ছেলে—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পিনো ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর জননী তিনি।
রাজনীতিতে আগমন
স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এক বছরের মধ্যেই দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীত্ব ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা
খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ওই সময় সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে বাংলাদেশ।
১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে হওয়া নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।
মামলা, কারাবাস ও মুক্তি
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি কারাবরণ করেন। পরে জামিনে মুক্তি পান। ১/১১ পরবর্তী সময়ে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে তার পাঁচ বছরের সাজা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয় এবং পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পান তিনি। পরবর্তীতে দফা-দফায় সেই মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি পূর্ণ মুক্তি পান।
রাজনৈতিক কর্মসূচি ও শেষ সময়
২০১৭ সালে তিনি সর্বশেষ রাজনৈতিক সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। একই বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করে ত্রাণ বিতরণ করেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে যাওয়ার পর কার্যত সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি।
জন্মদিন পালন নিয়েও ছিল আলোচনার নানা অধ্যায়। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কেক কাটা হলেও পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত অবস্থার কারণে তিনি আর জন্মদিন উদযাপন করেননি।
এর আগে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ হন তিনি। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর মধ্যে দ্বিতীয় দফার দায়িত্বকাল ছিল এক মাস।
বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপি বিজয়ী হয়। ওই বছরই বেগম জিয়া পঞ্চম সংসদে প্রধানমন্ত্রী হন। তার নেতৃত্বেই সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন হয়।
১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাসের জন্য ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রণয়নের পর ওই বছর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যায় খালেদা জিয়ার দল বিএনপি, তিনি হন প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা।
১৯৯৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, গোলাম আজমের (একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত) নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী ও শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের সমন্বয়ে গঠিত চারদলীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী দলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেন তিনি। একইসঙ্গে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই সে বছর নির্বাচন থেকে বিরত থাকে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় খালেদা জিয়া যখন কারাগারে, তখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যে সমন্বয় করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে থাকায় সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি খালেদা জিয়া। এমনকি এই নির্বাচনে জিয়া পরিবারের কোনো সদস্যই অংশগ্রহণ করেননি। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয়নি তার দল।
বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। সেখানে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ৪৮ ট্রাক ত্রাণ বিতরণ করেন খালেদা জিয়া।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে কারাগারে যাওয়ার আগে ৭ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া শেষবার সংবাদ সম্মেলন করেন। শায়রুল কবির খান উল্লেখ করেন, বেগম জিয়া সর্বশেষ সমাবেশ করেন ২০১৭ সালে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট ৫০ পাউন্ডের কেক কেটে জন্মদিন পালন করেন খালেদা জিয়া। ২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে তিনি কেক না কাটলেও সন্ধ্যার পরে কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন। আর ২০১৬ সালে বন্যা, গুম-খুনের কারণে কেক কাটেননি। ২০১৭ সালে জন্মদিনে লন্ডনে ছিলেন খালেদা জিয়া। এরপর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ৭৪তম জন্মদিনে তিনি ছিলেন পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে। এরপর আর কখন জন্মদিনে কেক কাটেননি বিএনপি চেয়ারপারসন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন ও অর্জনের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ও প্রভাবশালী চরিত্র হয়ে থাকবেন—সমর্থক ও সমালোচক, উভয়ের কাছেই।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।