ভোরের আলো ফুটতেই বেলুয়া নদীতে ভিড়তে শুরু করে একের পর এক নৌকা। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনোটি ধান-চাল, আবার কোনো নৌকায় আখ ও নানা ধরনের কৃষিপণ্য। নৌকাগুলোই যেন একেকটি ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম ও কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকজুড়ে জমে ওঠে ব্যতিক্রমী এক বাজার।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে সপ্তাহে দুই দিন বসে এই ভাসমান বাজার। শনিবার ও মঙ্গলবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এ বাজার জমজমাট থাকে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিটি হাটে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তরমুজের মৌসুমে এই লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় ১ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয়দের কেউ কেউ নদীকেন্দ্রিক এ বাজারের সঙ্গে ইতালির ভেনিসের তুলনা করেন। এ কারণে বৈঠাকাটা বাজারকে অনেকে ‘বাংলার ভেনিস’ নামেও ডাকেন।
নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বৈঠাকাটা বাজারটি নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মানুষের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নাজিরপুর অংশে বেলুয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে এই ভাসমান হাট।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নৌকা নিয়ে বাজারে আসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে নৌকার সারি ও ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। দ্রুত কেনাবেচা শেষ করে সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে অধিকাংশ নৌকা ফিরে যেতে শুরু করে।
নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে এখানে আসেন। একইভাবে নেছারাবাদের বিভিন্ন গ্রাম এবং বানারীপাড়ার বিশারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠী, কদমবাড়ি ও চৌমোহনাসহ আশপাশের এলাকার কৃষকেরাও পণ্য বিক্রি করেন।
বাজারে বরবটি, কুমড়া, পুঁইশাক, করলা, পটল, কাঁকরোল, কাঁচকলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শালগম, কচু, চালকুমড়া, নারিকেল, কলা, শাপলা ও সবজির চারাসহ নানা কৃষিপণ্যের সমারোহ দেখা যায়। ডিঙি নৌকায় করে কৃষকেরা এসব পণ্য নিয়ে আসেন। পাশাপাশি পাইকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও নৌকা নিয়ে জড়ো হন।
শুধু কৃষিপণ্য নয়, বেলুয়া নদীর ভাসমান বাজারে রয়েছে চায়ের দোকান, পিঠা ও বিভিন্ন খাবারের দোকানও। নৌকার ওপরই সাজানো হয় এসব দোকানের পসরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইউনুস ব্যাপারী বলেন, তিনি গ্রাম থেকে পণ্য কিনে এনে বৈঠাকাটা বাজারে বিক্রি করেন। বেশিরভাগ সময় কাঁকরোল বিক্রি করেন। এ বাজারে বেচাকেনা ভালো হওয়ায় দামও ভালো পাওয়া যায়।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার বসে এবং সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে। বাজারের প্রধান পণ্য কাঁচা সবজি, নারিকেল ও তরমুজ। বর্তমানে প্রতি হাটে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার মতো বেচাকেনা হয়। তরমুজের মৌসুমে তা বেড়ে ১ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হয়।
ভাসমান কৃষির উপকরণও বিক্রি হয়
বৈঠাকাটা বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভাসমান কৃষির উপকরণ বিক্রি। এখানে শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি বিক্রি হয় বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও আগাছা। এগুলো দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে সবজি ও চারা উৎপাদন করেন স্থানীয় কৃষকেরা।
দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত এলাকায় পানির ওপর ভাসমান বেডে চাষাবাদের প্রচলন দীর্ঘদিনের। কচুরিপানা, তেঁপাপোনা, দুলালিলতা, ফেনাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে এসব বেড তৈরি করা হয়।
শ্যাওলা বিক্রেতা ইব্রাহিম বলেন, তিনি মোল্লারহাট থেকে শ্যাওলা নিয়ে বৈঠাকাটা বাজারে আসেন। কুড়ি হিসেবে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ভালো দিনে আট থেকে নয় হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়।
শ্যাওলা কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য তিনি শ্যাওলা কিনেছেন। এই শ্যাওলা দিয়ে বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করা হয়।
অর্থাৎ এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ—পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই নদী ও নৌপথের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ভাসমান বেডে সবজি ও চারা উৎপাদন করে পরে নৌপথে সেগুলো বৈঠাকাটা বাজারে নিয়ে আসেন কৃষকেরা।
শত বছরের কাছাকাছি ঐতিহ্য
বৈঠাকাটা বাজার ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে। তবে প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক দশক ধরে এই হাটে নৌকায় করে পণ্য কেনাবেচা হয়ে আসছে।
প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাজারে ব্যবসা করছেন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের আগেও এ হাট ছিল। তার ধারণা, বাজারটির বয়স ৭০ থেকে ৭৫ বছর হতে পারে।
স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান বলেন, তার বাবা-দাদার আমল থেকেই এখানে এভাবে পণ্য কেনাবেচা হতে দেখেছেন। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরাও এ বাজারে এসে কৃষিপণ্য কিনে নিয়ে যান।
পর্যটনের সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারে রয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাও। বাজারের দিনে নদীর বুকজুড়ে সারিবদ্ধ শত শত নৌকা, নৌকায় সাজানো রকমারি কৃষিপণ্য এবং কয়েক ঘণ্টার জমজমাট বেচাকেনা দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মৃধা বলেন, বৈঠাকাটা বাজারকে অনেকে ‘বাংলার ভেনিস’ হিসেবে চেনেন। বিদেশি পর্যটকেরাও এখানে আসেন। তবে যোগাযোগব্যবস্থা ও থাকার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। রাস্তাঘাট ও আবাসন সুবিধা উন্নত হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারকে ঘিরে ভেলা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও হয়েছে। এতে নদীর দুই পাড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, বৈঠাকাটা বাজারে নৌকার ওপর শাকসবজি, ফলমূল, সবজির চারা এবং চারা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ কেনাবেচা হয়। শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার বসে। বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও পাইকাররা এখানে এসে পণ্য কেনেন। তার তথ্য অনুযায়ী, বছরে এ বাজারে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।
বেলুয়া নদীর বুকে গড়ে ওঠা বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার তাই শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, নৌকাকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন অবকাঠামো ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই বাজারের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।