এমন কোনো খেলোয়াড় কি আছে, যার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঝুঁকির মুখে পড়ে যায় এক কিকেই? উত্তরে একজনের নাম সবার আগে আসবে—ব্রাহিম দিয়াজ।
এই বছর ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত আফকনে মরক্কোর এই খেলোয়াড় টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন। রাবাতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মাঠ ছেড়েছিল সেনেগাল। ১০ মিনিট পর খেলা শুরু হলে স্টপেজ টাইমে পেনাল্টি কিক নেওয়ার সুযোগ পান দিয়াজ। বল জালে জড়াতে পারলেই চ্যাম্পিয়ন। সবার চোখ তার দিকে। কিন্তু দুর্বল পানেনকা শট সহজে সেনেগালি গোলকিপারের হাতে তুলে দিয়ে স্তব্ধ করে দিলেন মরক্কান দর্শক-সমর্থকরা।
দিয়াজ হতাশায় ভেঙে পড়েন। তাকে বদলি করে মাঠ থেকে তুলে নে ওয়া হয়। সেনেগাল এক্সট্রা টাইমে গোল করে এবং মরক্কোর স্বপ্ন মরে যায়।
স্পেনের জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এক উবার ড্রাইভার পরের দিন ক্ষোভ ঝেরে জানান, আর কখনো মরক্কোর জার্সিতে দিয়াজকে দেখতে চান না। তিনি আসলে স্পেনে জন্ম নিয়েছিলেন, সেখানেই বেড়ে উঠেছেন। স্পেনের হয়ে যুব পর্যায়ে খেলেছেন। তার মরক্কোতে অভিষেক হয় ২০২৪ সালে। উত্তর আফ্রিকানদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি সমর্থকদের বলির পাঁঠা হয়েছেন।
আফ্রিকায় মরক্কোর মতো আর কোনো দল প্রবাসী খেলোয়াড়দের একীভূত করতে পারেনি। কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠ ছিল। তার একটি পেনাল্টি ব্যর্থতা আফকনে পুরো মাসের চমৎকারিত্ব মুছে ফেলে এবং পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বিষাক্ত করে তুলেছিল।
কিন্তু ফুটবলে সবসময় প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ আসে। ফ্রান্সের বিপক্ষে বৃহস্পতিবারের কোয়ার্টার ফাইনাল। এই ম্যাচের আগে বিশ্বকাপের অন্যতম নজরকাড়া খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন দিয়াজ।
সবাই গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা মেসি, হালান্ড, কেইন ও এমবাপেকে নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু দিয়াজ নীরবে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। পাঁচ ম্যাচে চারটি অ্যাসিস্ট তার, ফ্রান্সের মাইকেল অলিসে কেবল তার চেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের মালিক। মরক্কোকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে প্রভাবশালী পারফরম্যান্স করছেন তিনি।
ডানপ্রান্তে আশরাফ হাকিমির দারুণ খেলা, ইয়াসিন বুনোর দুর্দান্ত সেভ কিংবা ইসমাইল সাইবারির গোলগুলো যতটা না আলোচনায়, ততটাই আড়ালে দিয়াজের পারফরম্যান্স। সম্ভবত এমন কিছুই তার দরকার ছিল।
দিয়াজ কাতারে সেমিফাইনালে খেলা মরক্কান স্কোয়াডে ছিলেন না। আন্ডারডগ একটি দলের সঙ্গে সাফল্যের তুঙ্গে ওঠার অনুভূতি তার জানা নেই। ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার কারণে ক্লাব সতীর্থদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে তাকে। তার রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ অরেলিয়েন শুয়োমেনি ও কিলিয়ান এমবাপে ফ্রান্সকে আরেকটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে তুলতে বদ্ধপরিকর।
ক্লাব সতীর্থদের সঙ্গে দেখা হওয়া প্রসঙ্গে দিয়াজ বললেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদে তারা আমাদের সতীর্থ। চমৎকার খেলোয়াড়, চমৎকার মানুষ, কিন্তু কাল আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী। সবাই জিততে চায় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘আমরা একে অন্যকে শুভ কামনা জানাব, কিন্তু আগামীকাল আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী।’
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা বাড়াচ্ছে মূলত দিয়াজ বনাম এমবাপে দ্বৈরথ। যদিও ক্লাবে ফরাসি তারকার ছায়ায় চাপা পড়েছেন তিনি। কখনো এক মৌসুমে রিয়ালের ১৮টি ম্যাচে তাকে শুরুর একাদশে দেখা যায় না। আগের তিন মৌসুমের প্রত্যেকটির চেয়ে অনেক কম।
তবে সেসব ভুলে মরক্কোর জয় দেখতে মুখিয়ে দিয়াজ, ‘অ্যাসিস্ট কিংবা গোল আমার কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার নয়। অবদান রাখতে পারা সবসময় ভালো, কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো দল। যদি আমার সাহায্যের কারণে দল জেতে, তাহলে আমি সত্যি খুশি। আমি সবসময় দায়িত্ব নেই, আমি চাপের মুখোমুখি হতে পছন্দ করি।
আফকনের সেই নির্মম ফাইনালের পর বদলে গেছেন দিয়াজ। প্রত্যেক পাস, থ্রু বলে সেই হতাশার পানেনকা ভুলিয়ে দিতে চলেছেন তিনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ওই পানেনকার ব্যর্থতার পর তিনি সমালোচনায় নিজেকে গুটিয়ে নেননি। তিনি দুই পা শক্ত রেখে সামনে এগিয়ে গেছেন। চেয়েছেন আটলাস লায়নদের অগ্রগতি।
তিনি শেষ করলেন, ‘আমি বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখেছি। এটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো, মরক্কোকে প্রতিনিধিত্ব করা এবং দেশের জন্য সবকিছু দেওয়া। আমার উপদেশ (মরক্কোর তরুণদের) কখনো বিশ্বাস হারাবে না যে তোমরা তোমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারবে। দেখো, এখানে আমি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে।’
এখন তার সামনে বড় পরীক্ষা। ফ্রান্স ফেভারিট, আটলাস লায়নরা আন্ডারডগ। তারা যদি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফিরতে চায়, তাহলে এমন এক খেলোয়াড় তাদের প্রয়োজন যিনি মরক্কান খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে খারাপ সময় থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন।
দিয়াজ কি পারবেন সেই খেলোয়াড় হতে! আফকনের ফাইনালের সেই পেনাল্টি ব্যর্থতার প্রায়শ্চিত্ত করতে? তাহলে সেটা হবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দারুণ এক প্রত্যাবর্তনের গল্প… আর হ্যাঁ, শুধু তাকে পেনাল্টি নিতে বলবেন না!
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।