হোয়াইট হাউসের ‘ডিপ্লোম্যাটিক রিসেপশন রুম’ থেকে জাতির উদ্দেশে এক বিরল সন্ধ্যাকালীন ভাষণ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) দেওয়া এ ভাষণে তিনি মূলত তাঁর প্রশাসনের অর্জন তুলে ধরেন এবং ভোক্তাপণ্যের উচ্চমূল্যের দায় চাপান ডেমোক্র্যাট পূর্বসূরি জো বাইডেনের ঘাড়ে। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কোনো নতুন বা স্পষ্ট নীতিগত ঘোষণা তিনি দেননি।
২০ মিনিটেরও কম সময়ের ভাষণে দ্রুতগতিতে কথা বলতে দেখা যায় ট্রাম্পকে। তিনি বলেন, “১১ মাস আগে আমি এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দায়িত্ব নিয়েছিলাম, আর এখন সেটি ঠিক করছি।” বরাবরের মতোই তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না।
ভাষণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন কোনো পদক্ষেপের কথা না বলে ট্রাম্প দায় দেন আগের প্রশাসন, পুরোনো বাণিজ্যচুক্তি, অভিবাসন নীতি এবং তাঁর ভাষায় একটি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা’র ওপর। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ কমানো এবং কিছু পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনাসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁর সরকার সফল হয়েছে।
এ সময় তিনি ঘোষণা দেন, আগামী সপ্তাহে ১৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্যকে এককালীন ১ হাজার ৭৭৬ ডলার করে ‘ওয়ারিয়র ডিভিডেন্ড’ দেওয়া হবে। পাশাপাশি রিপাবলিকানদের একটি প্রস্তাবে সমর্থন জানান ট্রাম্প, যেখানে ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’-এর ভর্তুকির বদলে সরাসরি নগদ অর্থ জনগণের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে—যাতে তাঁরা নিজেরাই স্বাস্থ্যবিমার খরচ বহন করতে পারেন। তবে এ প্রস্তাব কংগ্রেসে এখনো পর্যাপ্ত সমর্থন পায়নি।
হলিডের সাজসজ্জায় সজ্জিত কক্ষে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমি চাই টাকা সরাসরি মানুষের হাতে যাক। এতে একমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিমা কোম্পানিগুলো।”
এই ভাষণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের জবাব দেওয়ার সুযোগ হলেও ট্রাম্প আবারও ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনায় মনোযোগ দেন। তিনি স্বীকার করেন, দাম এখনো বেশি, তবে দাবি করেন—যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, “আমি এই উচ্চ দাম কমাচ্ছি, খুব দ্রুতই তা নামবে।”
আগামী বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে জনমত গড়ে তুলে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে, যা নতুন কর্মসংস্থান ও কারখানা স্থাপনে ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, “এক বছর আগে দেশটা প্রায় মৃত ছিল। এখন আমরা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দেশ।”
এ ছাড়া খুব শিগগিরই ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করা হবে বলেও জানান ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, এমন কাউকে বেছে নেওয়া হবে, যিনি সুদের হার কমানোর পক্ষে থাকবেন—যাতে গৃহঋণের কিস্তি কমে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের কাজকে অনুমোদন করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে শুল্কনীতি ঘিরে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং ভোক্তাপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের যেকোনো সময়ের চেয়েও বেশি।
ভাষণের আগেই ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা ও নিউইয়র্কের সিনেটর চাক শুমার ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। ক্যাপিটল হিলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রথম দিন থেকেই খরচ কমাবেন। সেই প্রতিশ্রুতির কারণেই তিনি নির্বাচনে জিতেছিলেন। অথচ এখন খরচ কমা তো দূরের কথা, আরও বাড়ছে।”
উল্লেখ্য, এ ভাষণটি ট্রাম্প দিয়েছেন হোয়াইট হাউসের ‘ডিপ্লোম্যাটিক রিসেপশন রুম’ থেকে। সাধারণত জাতির উদ্দেশে ভাষণ ওভাল অফিস থেকেই দেওয়া হয়ে থাকে।
রয়টার্স অবলম্বনে
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।