কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে চারটি দেশকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে ইরান। দেশগুলো হলো ভারত, চীন, ইরাক ও কাতার। তবে এই ছাড়ের পেছনে কূটনৈতিক সমর্থন, ওষুধ সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্বার্থসহ নানা হিসাব কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সহ-সভাপতি আমির হায়াত মোকাদ্দাম ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সিকে (আইএসএনএ) এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, এসব দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে চলাচল করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও সেগুলোতে বাধা দিচ্ছে না।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পরপরই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয় তেহরান। এর জবাবে গত জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে পুনরায় নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
আমির হায়াত মোকাদ্দামের দাবি, বিশেষ ছাড়ের বিনিময়ে ভারত থেকে ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাবে ইরান। অন্যদিকে, কাতার ইতোমধ্যে তেহরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে।
তিনি জানান, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করবে ইরান। তবে কাতারের জাহাজ বিনা ফিতে চলাচল করতে পারবে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো টোল দিতে হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি তিনি।
ইরানের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব
ইরানের এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মানবাধিকার অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ রুজবেহ পারসি আল জাজিরাকে বলেন, ইরানি আইনপ্রণেতা যে যুক্তিই তুলে ধরুন না কেন, মূল বিষয় হলো এই ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। ফলে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বাণিজ্য দেশটির জন্য নতুন কিছু নয়। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো, অবরোধের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সেবা আদান-প্রদানের পথ তৈরি করা।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে ইরান ট্রানজিট ফি অথবা পণ্যের মূল্যের নির্দিষ্ট অংশ আদায় করতে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং লিবিয়ায় অস্ট্রিয়ার সাবেক ডিফেন্স অ্যাটাশে উলফগ্যাং পুশতাই বলেন, কয়েকটি কারণে ইরানের এই পদক্ষেপ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সফল হলে তেহরানের বিপুল রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই কিনে থাকে দেশটি। ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দেশটির রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে চার দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক আয়, প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ এবং কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে ইরান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: আল জাজিরা।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।