সকল মেনু

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত অক্টোবরেই, আশাবাদী বাণিজ্যমন্ত্রী

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইআরএফের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ’স এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ট্রাজেক্টরি: ক্রিটিক্যাল চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড এক্সপ্লোরিং পলিসি অপশনস’।

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর অগ্রগতি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ বাংলাদেশ পার করেছে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশের বাড়তি সময় পাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমি খুবই আশাবাদী, সামনের সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহে আমরা জিনিসটার একটা নিষ্পত্তি দেখব।’ আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করেন তিনি।

তিন বছর সময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না। উত্তরণের সুবিধা কাজে লাগানো এবং সম্ভাব্য অসুবিধা মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরির চেয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে।

ইইউর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য

এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে, যদিও দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের আগেই এ আলোচনা শেষ করতে চান তাঁরা।

ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তবে আশা করি জিএসপি প্লাসের অপশনটা আমাদের নিতে হবে না, তার আগেই আমরা এফটিএটা কমপ্লিট করব।’

ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ

দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র নেওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগে। এত দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ও উদ্যম কমিয়ে দেয়।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে।

যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা এবং বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমতি সংগ্রহে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘসূত্রতা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি সরবরাহে জোর

জ্বালানি সংকটকে নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বাংলাদেশ চাপে পড়ে উল্লেখ করে তিনি কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সমন্বিত লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য দেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আখতার মালা। সমাপনী বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top