সকল মেনু

জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের চাপে এশিয়ার প্রবৃদ্ধি, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগে সম্ভাব্য ধাক্কায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

আইএমএফের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে জ্বালানির দাম বাড়তি পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। পাশাপাশি সরকারি ঋণ ও অর্থায়নের চাহিদা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারে সুদের হার বাড়তে পারে। এতে এশিয়ার দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়াতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, উৎপাদন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দেশের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

১৫ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এশিয়ার অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বাংলাদেশের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।

এশিয়ার অর্থনীতিতে তিন বড় ঝুঁকি

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগ তিনটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, এআই খাতে বিনিয়োগে সম্ভাব্য সংশোধন এবং বৈশ্বিক বন্ডবাজারে সুদের হার বৃদ্ধি।

সংস্থাটির ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত আঞ্চলিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য উদীয়মান এশিয়ার প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এআই প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা বাড়ায় সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদন এবং ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি এশীয় অর্থনীতি তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, এশিয়ার অর্থনীতিতে বর্তমানে তিনটি বড় শক্তি প্রভাব ফেলছে—জ্বালানির ধাক্কা, প্রযুক্তি খাতের উত্থান এবং বাণিজ্যের কাঠামোগত পরিবর্তন। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া জ্বালানি সংকট এমন একটি অঞ্চলকে আঘাত করেছে, যেটি তেল ও গ্যাসের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

তিনি জানান, কিছু দেশ জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, চাহিদা কমানো, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং মজুত থেকে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন কমানো এবং মানুষের আয় সুরক্ষায়ও বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শ্রীনিবাসনের মতে, এআই অবকাঠামোর চাহিদা বাড়ায় চিপ উৎপাদন ও ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ানের কয়েকটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উন্নত হয়েছে। তবে প্রযুক্তি খাতের এই উত্থান থেকে সরাসরি সুবিধা না পাওয়া দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এশিয়ার দেশগুলোর জন্য তরুণদের কর্মসংস্থান, দক্ষতার ঘাটতি পূরণ, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ গভীর করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়তে পারে ঋণ পরিশোধের ব্যয়

আইএমএফের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোজোন ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতিতে সরকারি ঋণবাজারে চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব এশিয়ার বন্ডবাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সুদের হার বাড়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। আগে থেকেই উচ্চ ঋণ ও বড় অর্থায়ন চাহিদায় থাকা দেশগুলোর সরকারি অর্থব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম উঁচু থাকতে পারে এবং তেলের মজুত কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, এআই খাতে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূল্যস্থিতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছেন। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।

সরকারি ব্যয়ের বিষয়ে তার পরামর্শ, সহায়তা হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকি বা ব্যয়বহুল মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি অর্থের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগ

আইএমএফের আঞ্চলিক পূর্বাভাসসংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন।

তার মতে, বাংলাদেশকে রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ জন্য অন্যান্য কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

আইএমএফ বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে আর্থিক খাত শক্তিশালী করতে বিশ্বাসযোগ্য কৌশল গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার।

সোনালি জৈন-চন্দ্র জানান, বাংলাদেশ সরকার মে মাসে নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির অনুরোধ করেছে। আগের কর্মসূচির আওতায় আর অর্থ ছাড় না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। জুলাইয়ে আইএমএফের একটি দল ঢাকায় গিয়ে সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এরপরও দুই পক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে

১৫ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সংস্কার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান বৈশ্বিক সংঘাত বিবেচনায় বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট। তবে ব্যাংক খাত ও কর-জিডিপি অনুপাতসহ কয়েকটি বিষয়ে সংস্থাটির উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশও কিছু বিষয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।

অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, আলোচনায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আগামী মাসগুলোতে আলোচনা চলবে। ব্যাংক খাতের পুনঃমূলধনীকরণ, কর-জিডিপি অনুপাত এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জ্বালানি ব্যয় ও রাজস্ব সংস্কারের চাপ

বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

একই সঙ্গে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপে থাকা পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি জানান, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশল নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিগুলো আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হবে বলে সরকার আশা করছে।

রাজস্ব সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কাজ আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা বাড়ানো, করদাতাদের হয়রানি কমানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

উন্নয়ন প্রকল্পে দ্রুত অর্থ ছাড়ের তাগিদ

বিশ্বব্যাংকের আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। তার মতে, সরকারি অনুমোদন ও বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর করে দেয়। তাই দুই পক্ষের অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সমন্বিত করা প্রয়োজন।

সরকারের লক্ষ্য ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাড়ার সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে উন্নয়নের সুফলও দেরিতে মানুষের কাছে পৌঁছায়। তাই আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকি বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন খরচের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিতেও চাপ পড়তে পারে। বৈশ্বিক সুদের হার বাড়লে নতুন ও বিদ্যমান ঋণের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ দ্রুত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top