প্রিয়াঙ্কা শঙ্কর
ভারতে তরুণদের বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও রাজধানী নয়াদিল্লিতে উত্তেজনা কমেনি। বরং নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে তরুণদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও যুক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
আলজাজিরার সাংবাদিক প্রিয়াঙ্কা শঙ্করের এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচিত তরুণ সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি), বিভিন্ন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিরোধী দলের রাজনীতিকদের আটক করা হয়েছিল। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আটকাদেশকে বেআইনি আখ্যা দিলে রোববার তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
কারামুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘নিপীড়ক’ ও ‘কাপুরুষ শাসক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, ভারতের ইতিহাসে এমন ভীরু প্রধানমন্ত্রী আগে দেখা যায়নি।
আন্দোলনের মূল দাবি নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন একটি প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, যাতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পাচ্ছে। কারিগরি ত্রুটি ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু মুসলিমসহ কোটি কোটি নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। ভারতের তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এর পরই বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা, আটক নেতাকর্মীরা
শনিবারের সমাবেশ ঠেকাতে নয়াদিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় প্রশাসন। সংসদের কাছে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান যন্তর মন্তর বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান সড়কগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের খোঁজা হয়। কংক্রিটের ব্যারিকেড ও কাঁদানে গ্যাসের গাড়ি দিয়ে বিভিন্ন সড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পাশাপাশি মেট্রো ও ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখা এবং রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপক ও তাঁর দুই সহযোগী সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক করা হয়। জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরা এবং বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকেও সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ছোট পরিসরে জমায়েতের চেষ্টা করলেও পুলিশ বাধা দেয়। মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ করতে গিয়ে প্রায় ৬০০ জন গ্রেপ্তার হন। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের হেনস্তা ও আটকের অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিক্ষোভকারীদের ওপর আচরণ নিয়ে অভিযোগ
দিল্লির ভিজ্যুয়াল শিল্পী আবান রাজা জানিয়েছেন, তিনি অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজসহ কয়েকজন শনিবার সকালে ব্যানার নিয়ে যন্তর মন্তরের দিকে যাচ্ছিলেন। সেখানে পৌঁছালে পুলিশ তাঁদের ব্যানার কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে এবং জোর করে বাসে তুলে নেয় বলে তাঁর অভিযোগ।
আবান রাজার দাবি, আটক ব্যক্তিদের সবাই বিক্ষোভকারী ছিলেন না। কেউ গুরুদুয়ারায় যাচ্ছিলেন, কেউ কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। শ্রমজীবী মানুষকেও রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব ঘটনায় ভয় না পেয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
বিরোধীদের সমর্থন, সরকারের অনড় অবস্থান
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন কর্মসূচির ঘোষণাও দিয়েছে তারা।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানো না পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেছেন, মোদি সরকার গণতন্ত্রের দেশকে এমন এক শাসনব্যবস্থায় পরিণত করছে, যেখানে মানুষের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, লাঠি, গুলি কিংবা কারাগার দিয়ে তরুণদের আটকে রাখা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগের জবাবে বিজেপি দাবি করেছে, বাদ পড়া ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ মারা গেছেন, ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ সংশ্লিষ্ট এলাকা ছেড়ে গেছেন এবং বাকিদের ঠিকানা মেলেনি।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের নৈরাজ্যবাদী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, টেলিভিশনে যা দেখা যাচ্ছে, তা ভারতের প্রকৃত চিত্র নয়; দেশ শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নিলে বিরোধীদের ভোট কারচুপির অভিযোগ আরও জোরালো হতে পারে। এতে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষক সঞ্জয় কাপুরের মতে, আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ আর মোদি সরকারের শাসন দেখতে চায় না। ফলে সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
ভারতে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর উদ্বেগ জানিয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনায় বসার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচও অভিযোগ করেছে, নাগরিকদের উদ্বেগ বিবেচনায় না নিয়ে সরকার সমালোচকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করছে।
তবে জেনেভায় ভারতের জাতিসংঘ মিশন এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ ধরনের হস্তক্ষেপ অনাকাঙ্ক্ষিত এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দমন-পীড়নে কি বাড়বে আন্দোলন?
আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তরুণ আন্দোলনকারীদের দৃঢ় অবস্থানের কারণে বিক্ষোভ দ্রুত থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জয়তী ঘোষের মতে, সরকার জনগণের ক্ষোভের গভীরতা বুঝতে পারছে না। দমন-পীড়নের মাধ্যমে সেই ক্ষোভ কমানোর বদলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সাংবাদিক সঞ্জয় কাপুরের ধারণা, নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আশঙ্কা করছেন, এই আন্দোলন পূর্ব ইউরোপের রঙিন বিপ্লব কিংবা নেপাল ও বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির আগের অস্থিরতার তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, বলপ্রয়োগের কারণে বিক্ষোভ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং ভারত গভীর অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিরোধীদের সমর্থন—এই তিনটি বিষয় আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। সরকারের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে তরুণদের প্রতিবাদ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও আলোচনার সুযোগ তৈরি হয় কি না, তার ওপর।
লেখক পরিচিতি
প্রিয়াঙ্কা শঙ্কর ব্রাসেলস ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নাগরিক অধিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ে তিনি নিয়মিত আলজাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন লিখে থাকেন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।