আরেকবার যখন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের বড় ম্যাচে মুখোমুখি, তার কয়েকদিন আগেই প্রয়াত হয়েছেন আলবিসেলেস্তে কিংবদন্তি অ্যান্তোনিও রাত্তিন। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড নাটকীয় দ্বৈরথে তিনিও অংশ হয়ে আছেন। এরপর দিয়েগো ম্যারাডোনা, ডেভিড বেকহ্যাম হয়ে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আঁচ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
২১ বছর আগে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দুই জায়ান্ট দলের। ২০০৫ সালে প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের ৩-২ ব্যবধানে জয়ের পর আর কখনও মুখোমুখি হয়নি তারা। আর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের দেখা হতে যাচ্ছে ২৪ বছর পর। দুই দলের ইতিহাসে রয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ও বিতর্কিত অধ্যায়। আগামীকাল (বুধবার) দিবাগত রাতে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মেসি-কেইন মুখোমুখি হওয়ার আগে ফিরছে অতীতের ৫ আলোচিত ঘটনা।
লাল কার্ডের পর রাত্তিনকে মাঠ থেকে তুলতে পুলিশের হস্তক্ষেপ
১৯৬৬ বিশ্বকাপে ওয়েম্বলিতে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক অ্যান্তোনিও রাত্তিনকে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে মাঠ থেকে বের করে দেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রিটলিন। রাত্তিন রেফারির ভাষা বুঝতে না পেরে একজন দোভাষীর দাবি জানান এবং ওই ঘটনায় লেগে যায় প্রায় ১০ মিনিট। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাকে বাইরে নিয়ে যায়।
ওই সময় ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার আসন্ন ম্যাচ দেখা হলো না রাত্তিনের, ৮৯ বছর বয়সে তিনি সম্প্রতি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন।
চেরিকে ঘুষি মেরে দুই দাঁত ফেলে দেন বার্তোনি
১৯৭৭ সালে লা বোম্বোনেরায় অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচে ঘটে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা। ম্যাচ শেষ হওয়ার সাত মিনিট আগে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি পেছন দিক থেকে কড়া ট্যাকল করেন আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল বার্তোনিকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বার্তোনি উঠে দাঁড়িয়ে চেরির মুখে সরাসরি ঘুষি মারেন। ঘুষিতে চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়।
পরে দুজনকেই লাল কার্ড দেখানো হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে লাল কার্ড দেখা প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হন ট্রেভর চেরি। বার্তোনিকে সঙ্গে নিয়েই তিনি ছাড়েন!
পচেত্তিনোর ফাউল ও বেকহামের জয়সূচক পেনাল্টি
২৪ বছর আগে দুই দলের সর্বশেষ দেখায়ও ছিল বিতর্ক, তবে এবার সুবিধা পেল ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের শেষদিকে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মরিসিও পচেত্তিনো ইংলিশ ফরোয়ার্ড মাইকেল ওয়েনকে বক্সে ফাউল করেছেন বলে সিদ্ধান্ত দেন ইতালিয়ান রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করেন ডেভিড বেকহ্যাম। সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে নকআউট পর্বে ওঠে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
২০১৬ সালে টটেনহ্যামের কোচ থাকাকালে পচেত্তিনো সেই বিতর্ক উসকে দিয়ে বলেছিলেন, ‘১৫ বছর আগে ওয়েন ডাইভ দিয়েছিল। ইংলিশ ফুটবল সব সময় ন্যায্য– এটা বিশ্বাস করবেন না। ওয়েন যেন সুইমিং পুলে ঝাঁপ দিয়েছিল। আমি তাকে স্পর্শই করিনি। আমি নিশ্চিতভাবে বলছি এটা সত্যি।’
বেকহ্যামের লাল কার্ড
দুই দলের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বাধিক আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। খেলার প্রথমার্ধ শেষে স্কোর ছিল ২-২। ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেন অ্যালান শিয়েরার ও মাইকেল ওয়েন। আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও হাভিয়ের জানেত্তি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দিয়েগো সিমিওনের ফাউলের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তাকে লাথি মারেন ডেভিড বেকহ্যাম। যার সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখান রেফারি। এরপর ১০ জন নিয়েও ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। যেখানে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টারে ওঠে। ২০১৮ সালে কলম্বিয়াকে হারানোর আগপর্যন্ত যে অভিশাপ ইংল্যান্ডকে তাড়া করে ফিরেছিল। এবার তারা লাতিন দেশটিকে একই রাউন্ডের ম্যাচে পেনাল্টি শ্যুটআউটে হারাল সমান ৪-৩ ব্যবধানে।
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের কথা উঠলেই সবার আগে আসে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ দৃশ্য। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দ্বিতীয়ার্ধের ষষ্ঠ মিনিটে গোলশূন্য অবস্থায় পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান ম্যারাডোনা। রেফারি আলি বিন নাসের সেখানে কোনো অপরাধ দেখেননি এবং গোলের স্বীকৃতি দেন। ম্যারাডোনা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন, আর ক্ষোভে ফেটে পড়েন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা।
এর মাত্র চার মিনিট পর ম্যারাডোনা করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। নিজেদের অর্ধ থেকে প্রায় ৬০ গজ বল টেনে চার ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে শিলটনকে পরাস্ত করেন। সেই গোলটি আজও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত। যাকে পরবর্তীতে ম্যারাডোনা সাব্যস্ত করেন– ‘নিজের মাথার একাংশ ও আরেকাংশে ছিল ইশ্বরের হাতের স্পর্শ’!
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জেতে আর্জেন্টিনা। এক সপ্তাহ পর আলবিসেলেস্তেরা নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের উৎসবে মাতে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।