চলতি বছরের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৭৩টি শহরের এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭১তম। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও একই অবস্থানে ছিল ঢাকা। সোমবার ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) বার্ষিক বাসযোগ্য শহরের তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামোসহ নানা ৩০টিরও বেশি গুণগত ও পরিমাণগত সূচক বিশ্লেষণ করে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রতি বছর ১৭৩টি শহরের এই তালিকা তৈরি করে।
ইআইইউয়ের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় চলতি বছরের জরিপে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৪২ স্কোর পেয়েছে ঢাকা। এই স্কোর নিয়ে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ২০২৫ সালেও একই অবস্থানে ছিল ঢাকা।
বাসযোগ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের রাজধানীর নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি এবং সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। ইআইইউ বলেছে, চীনের বিভিন্ন শহরের স্বাস্থ্যসেবার মানের উন্নয়ন আর জাপানের অগ্রগতির ওপর ভর করে সব অঞ্চলের মধ্যে এশিয়াতে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ এই অঞ্চলের অনুন্নত দেশগুলোর কিছু শহরের কম স্কোরের কারণে সামগ্রিক গড় উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। ইআইইউয়ের এই সূচকে স্থিতিশীলতায় ৪৫, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪১, শিক্ষায় ৬৭ এবং অবকাঠামোতে মাত্র ২৭ স্কোর পেয়েছে ঢাকা।
সূচকে বলা হয়েছে শিক্ষা খাত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক নগর পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা ঢাকার বাসযোগ্যতাকে ক্রমাগত তলানির দিকে টেনে নামাচ্ছে।
চলতি বছরের সূচক অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড় বাসযোগ্যতার স্কোর ৭৬.১-এ অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির জেরে বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতার সূচকে অবনতি ঘটেছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নতির পাশাপাশি চীনের অগ্রগতির ঘটনায় সামগ্রিক বৈশ্বিক সূচকের পতন এড়ানো গেছে।
তালিকার তলানির দিকে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের করাচি ৪৩ স্কোর নিয়ে ঢাকার ঠিক এক ধাপ ওপরে, অর্থাৎ ১৭০তম অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে তালিকার শীর্ষে থেকে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের খেতাব ধরে রেখেছে। এর পরের দুটি অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভিয়েনা ও মেলবোর্ন।
এশিয়ার সামগ্রিক উন্নতি সত্ত্বেও এই সুফল সব শহরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। ঢাকা আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এশিয়ার গড় বাসযোগ্যতার স্কোর বেড়ে ৭৪ হলেও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার স্কোর তার চেয়ে ৩২ পয়েন্ট কম।
প্রতিবেদনে এশিয়ার শহরগুলোর মাঝে বড় বৈসাদৃশ্যও দেখা গেছে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ঘটিয়ে চীনের কয়েকটি শহরের সূচকে উন্নতি ঘটেছে। আবার সংস্কৃতি ও পরিবেশের উন্নতি করে সূচকে ওপরে উঠে গেছে জাপানের রাজধানী টোকিও
সেখানে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহরের তালিকাতেই আটকে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শহরের মতো কোনও যুদ্ধবিগ্রহের কারণে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতাই ঢাকার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে সূচকে বলা হয়েছে।
এর আগে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৫ সালের সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা তিন ধাপ পিছিয়ে ১৭১তম স্থানে নেমে গিয়েছিল। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৬৮তম এবং ২০২৩ ছিল ১৬৬তম।
বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় আগের মতোই তলানিতে রয়েছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সূচকের তলানির দিকে বড় ধরনের ওলটপালট হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে ১৬৪তম স্থানে নেমে গেছে ইরানের রাজধানী তেহরান। আর ১৬৬তম স্থানে রয়েছে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ।
ইআইইউর শিল্প পরিচালক অ্যানা নিকোলস বলেন, ‘‘বিশ্বব্যাপী গড় বাসযোগ্যতার স্কোর গত বছরের মতোই রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার সূচক যতটা কমেছে, এশিয়ার শহরগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন তা পুষিয়ে দিয়েছে। ফলে ১৭৩টি শহরের সামগ্রিক গড় স্কোরে ভারসাম্য বজায় রয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘এশিয়ার শহরগুলোর স্কোর বৃদ্ধি পাওয়ায় শীর্ষ ২০টি বাসযোগ্য শহরের তালিকায় এখন এশিয়ারই ৯টি শহর জায়গা করে নিয়েছে। এর পাশাপাশি ইউরোপের শহর রয়েছে ৭টি।’’
• বিশ্বের শীর্ষ ১০ বাসযোগ্য শহর
১. কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক
২. ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
৩. মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া
৪. সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
৫. জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
৬. জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
৭. ওসাকা, জাপান
৮. অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া
৯. ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা
১০. টোকিও, জাপান
সূত্র: ইআইইউ।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।