উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বগুড়া বিমানবন্দরকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করতে বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দরটির রানওয়ে সম্প্রসারণ, আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নেভিগেশন সুবিধা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বগুড়াসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের আওতায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, রানওয়ে ও পেভমেন্ট ডিজাইন, টার্মিনাল ভবনের নকশা এবং অন্যান্য কারিগরি সহায়তা দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বগুড়া বিমানবন্দর আধুনিকায়ন করা হলে বগুড়া ছাড়াও জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও কৃষিযন্ত্রপাতির দ্রুত পরিবহন এবং রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান এখানে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে বিমানবন্দরটি মূলত সামরিক প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরে ৪ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে রয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো নেই। উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় রানওয়ে ১০ হাজার ফুটে সম্প্রসারণ, নতুন ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোন নির্মাণ, আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল ভবন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের নেভিগেশন ও লাইটিং সিস্টেম স্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অংশ হিসেবে ভূ প্রকৌশল জরিপ, মৃত্তিকা পরীক্ষা, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং আর্থিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, পার্কিং এলাকা, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এরুলিয়া এলাকার বাসিন্দা আমিনুর ইসলাম বলেন, বিমানবন্দর চালু হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এলাকার অর্থনীতি চাঙা হবে। তবে স্থানীয় উদ্যোক্তা সেলিম সরকার বলেন, বিমানবন্দর চালুর ঘোষণা বহুবার এসেছে। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি খুব কম দেখা গেছে। এবার দ্রুত কাজ শুরু হয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চান মানুষ।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি ও উদ্যোক্তা মো. সাইরুল ইসলাম বলেন, উত্তরবঙ্গের অন্যতম কৃষি ও সবজি উৎপাদনকারী জেলা বগুড়া। বিমানবন্দর চালু হলে জেলার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। তারা দ্রুত ও সহজে তাদের কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দর চালুর ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য সরবরাহ আরও সহজ ও সময়সাশ্রয়ী হবে। বগুড়ার পাশাপাশি আশপাশের জেলার ব্যবসায়ী ও উৎপাদকরাও এ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
সাইরুল ইসলাম আরও বলেন, বগুড়া বিমানবন্দর চালু হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা এ অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে, গত ৭ মে বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এবং বিমান বাহিনীর প্রধান। পরিদর্শন শেষে উপদেষ্টা আফরোজা খানম বলেন, উত্তরবঙ্গের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বগুড়াতেই নির্মিত হবে। পাশাপাশি এখানে একটি ফ্লাইং একাডেমি স্থাপন এবং বগুড়াকে অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বগুড়া বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বগুড়া বিমানবন্দর চালু হলে বিসিক শিল্পনগরীসহ জেলার ভেতর ও বাইরের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। বিমানবন্দর চালু হওয়ার ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত ও সহজে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বগুড়াই নয়, আশপাশের জেলার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও এর সুফল ভোগ করবেন। বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা সরাসরি বগুড়ায় আসতে পারবেন, ফলে শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়িক সফরে যেতে পারবেন, যা রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, বিমানবন্দর উন্নয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে এবং বগুড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।