দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দীর্ঘ ক্লাস আর লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে একদল শিক্ষার্থী ঢুকছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক আবাসিক হলের ক্যান্টিনে। কারও হাতে ৬০ টাকার শেষ নোট, কেউ আবার হিসাব কষছেন মাসের বাকি দিনগুলো কীভাবে চলবে। প্লেটে ভাত তুলে দেওয়া হয়, পাশে ছোট্ট এক টুকরো মুরগি কিংবা মাছ। সবজির দিকে তাকিয়েই অনেকের মুখ ভার হয়ে যায়। কেউ খাবারের মধ্যে পোকা খুঁজে পান, কেউ পান চুল। তবুও খেতে হয়। কারণ অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে এর বাইরে আর কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ব্যবস্থা এখন শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু খাবারের জায়গা নয়, বরং প্রতিদিনের এক ধরনের বাধ্যতামূলক আপসের নাম। নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, পুষ্টিহীন মেন্যু ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্যান্টিনের রান্নাঘরই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও মেঝেতে পড়ে আছে সবজির উচ্ছিষ্ট, কোথাও স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের পাশে রান্না হচ্ছে খাবার। অনেক রান্নাঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসও নেই। রান্নার কাজে ব্যবহৃত তেল ও মসলার মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খাবারের দাম বাড়লেও মান বাড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের গুণগত মান আরও কমেছে। কবি জসিমউদ্দীন হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, “৪৫-৫০ টাকা দিয়ে এক পিস মাছ বা মাংস কিনি, কিন্তু সেটা দেখে মনে হয় শুধু নামেই মাছ-মাংস। খেয়ে পেট ভরলেও শরীরের কোনো উপকার হয় না।”
এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাবির আবাসিক হলের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা। বাইরে নিয়মিত খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় হল ক্যান্টিনই তাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাটিই এখন শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী রিয়া আক্তার বলেন, “প্রথম প্রথম হলের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তাম। পরে হয়তো শরীর মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু খাবারের মধ্যে পোকা বা চুল পাওয়া এখন এত সাধারণ হয়ে গেছে যে অনেকেই আর অভিযোগও করে না।”
আরেক শিক্ষার্থী রাত্রি জাহান বলেন, “এটা শুধু নিম্নমানের খাবারের সমস্যা না, এটা অবহেলার প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি থাকলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না।”
২০২৩ সালের এক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ক্যান্টিনের খাবারে ই. কোলাইসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী হাউস টিউটরদের প্রতি সপ্তাহে ক্যান্টিন তদারকি করার কথা। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই তা দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্যান্টিন কর্মচারী বলেন, “স্যারেরা কয়েক মাস পর পর একবার আসেন। তখন একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। পরে আবার আগের মতো হয়ে যায়।”
তবে ক্যান্টিন মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে কম মূল্যে ভালো মানের খাবার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক জমির উদ্দিন বলেন, “বাজারে সব কিছুর দাম অনেক বেড়েছে। এই দামে ভালো খাবার দিতে গেলে লাভ তো থাকেই না, অনেক সময় টিকেই থাকা কঠিন হয়ে যায়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক কাজী রেজাউল করিম মনে করেন, হল ক্যান্টিনের খাবারে সুষম পুষ্টির বড় ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা যে খাবার খাচ্ছে, সেখানে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন বা পুষ্টি নেই। ভালো তেল ব্যবহার করা হয় না, ফলও থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
সমাধান হিসেবে শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিনে ভর্তুকি বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিং, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।
ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, “আমরা বিভিন্ন ক্যান্টিনে তদারকি করছি এবং প্রশাসনের কাছে ভর্তুকির দাবিও জানিয়েছি। টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য সরবরাহের একটি পরিকল্পনাও ছিল, তবে সেটি আর এগোয়নি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, “টিসিবি থেকে পণ্য সংগ্রহ করা গেলে কম খরচে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।”
তবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন একটাই—আলোচনা আর আশ্বাসের বাইরে বাস্তবে কবে বদলাবে হল ক্যান্টিনগুলোর চিত্র? কবে প্লেটে মিলবে অন্তত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার?
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।