উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। গত জানুয়ারিতে এই খাতে নিট বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, যা আগের কয়েক মাসের ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতারই অংশ।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর আগের ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই নিট বিনিয়োগ ছিল ইতিবাচক।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থাহীনতা ও শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকিমুক্ত খাত খুঁজছেন। সেই জায়গায় সঞ্চয়পত্রই হয়ে উঠছে প্রধান বিকল্প। বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতিও এ প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।
সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। এরপর কিছুটা কমলেও আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে মূল্যস্ফীতি বাড়া এবং সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমার পরও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবু সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার এখনো বেশি। পাশাপাশি বিনিয়োগের শর্তও কিছুটা শিথিল করেছে সরকার। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কিনতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে; আগে এই সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা। ব্যক্তি পর্যায়ে মেয়াদ শেষে পুনর্বিনিয়োগ সুবিধাও চালু করা হয়েছে। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের মেয়াদি হিসাবেও এই সুবিধা ফিরেছে। এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়া এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মুনাফা তিন মাসের বদলে প্রতি মাসে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চয় কমার কথা থাকলেও বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। মানুষ এখন নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে। তুলনামূলক বেশি মুনাফার কারণে সঞ্চয়পত্রই তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাত ঋণাত্মক ছিল প্রায় ৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা।
গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও বিক্রি কমে যাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এরপরও পুরো বছর শেষে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতাই বেশি ছিল।
এর আগের দুই অর্থবছরেও একই প্রবণতা ছিল। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকা করা হয়। তবে ওই বছর নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয় প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। ২০২২–২৩ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।
বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এসব সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণভেদে মুনাফার হার সর্বোচ্চ প্রায় ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।