ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ধীরে ধীরে গতি ফিরছিল দেশের পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছিলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে কার্যত স্থবির হয়ে পড়া বাজারে আবার প্রাণ ফিরবে। নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেই মিলেছে সেই আভাস। রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অধিকাংশ শেয়ারের দাম বাড়ার পাশাপাশি লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস পর ডিএসইতে লেনদেন ছাড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক উত্থান অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোববার ডিএসইতে মোট ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে মাত্র ২৬টির এবং ৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ দরবৃদ্ধির তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি।
দাম বাড়ার ধারাবাহিকতায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২০১ পয়েন্ট বা প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬০১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৩০ পয়েন্ট বা প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে পৌঁছেছে। বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই–৩০ সূচক ৮৬ পয়েন্ট বা ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে উঠেছে।
সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ডিএসইতে এদিন মোট লেনদেন হয়েছে ১,২৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। সর্বশেষ গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর এর চেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছিল। সে হিসাবে প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ লেনদেন এবং এই সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
লেনদেনে শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংকের শেয়ার, যেখানে লেনদেন হয়েছে ৮০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা ব্যাংক (৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা) এবং তৃতীয় অবস্থানে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস (৪১ কোটি ৯ লাখ টাকা)।
বাজার–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এগোনোয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা বাজারে নতুন করে গতি এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচিত সরকারের সময় শেয়ারবাজারে নীতিগত গুরুত্ব বাড়বে—এমন ধারণাও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। তবে এই উত্থান কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশেকুর রহমান বলেন, বর্তমান উত্থান দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী নাও হতে পারে। তার ভাষায়, ‘২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর কয়েক দিনের যে উত্থান দেখা গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তেমনই হতে পারে। ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদহার থাকলে দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারে উন্নতি কঠিন। সুদহার কমলে বাজারে তারল্য বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, সরকার পরিবর্তনের সময় বাজারে আবেগনির্ভর (সেন্টিমেন্টাল) মুভমেন্ট দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় বাজারের গতি শুধু মৌলভিত্তির ওপর নয়, বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপরও নির্ভর করে।
অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সব মূল্যসূচক বেড়েছে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫১৯ পয়েন্টে এবং প্রধান সূচক সিএসসিএক্স ২৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ৫৫৫ পয়েন্টে উঠেছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২০টির দাম বেড়েছে, কমেছে ১৭টির এবং ১০টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। মোট লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই শেয়ারবাজার নিয়ে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার একটি ইতিবাচক ধারায় এগোবে। সরকার ঘোষিত কমিটমেন্টগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নই আমাদের প্রধান প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, বাজারে ভালো রিটার্ন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা বাজারে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারহোল্ডার পরিচালক ও বিএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, পুঁজিবাজারে আজকের উত্থানটি কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত ছিল। তাঁর মতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বাজারে ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। বিগত সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অনাস্থার প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়েছিল। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাজারে।
ডিএসই পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, আগামী কয়েক দিন বাজার ইতিবাচক থাকতে পারে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে ভালো মানের কোম্পানির শেয়ার বাজারে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করা ও ব্যাংক খাতে অনিয়ম রোধে নজর দিতে হবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।