ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে—পোস্টাল ভোট। সংখ্যায় এটি মোট ভোটারের মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ হলেও বাস্তবতায় এই ক্ষুদ্র অংশই বহু আসনে জয়–পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে পোস্টাল ভোট হয়ে উঠতে পারে ‘নির্ধারক ফ্যাক্টর’।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশি–বিদেশি মিলিয়ে ১৫ লাখের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার প্রায় সাড়ে সাত লাখ। সংখ্যাগতভাবে এটি খুব বড় না হলেও বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে—১০ হাজার বা তার কম ভোটের ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এমন ৩০টি আসনের নজির রয়েছে।
এবার সেই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পোস্টাল ভোটের ভৌগোলিক ঘনত্ব। অন্তত ১৮টি আসনে ১০ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। ফেনী-৩, চট্টগ্রাম-১৫, কুমিল্লা-১০ কিংবা নোয়াখালীর কয়েকটি আসনে এই সংখ্যা এতটাই বেশি যে সাধারণ ভোটে পিছিয়ে থাকা কোনো প্রার্থীও পোস্টাল ভোটে এগিয়ে গিয়ে জয় ছিনিয়ে নিতে পারেন। ফলে নির্বাচনী হিসাব এখন আর শুধু ভোটকেন্দ্রের লাইনে সীমাবদ্ধ নেই; এর একটি বড় অংশ ছড়িয়ে আছে পোস্ট অফিসের খামে।
তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। পোস্টাল ভোটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সময়। ভোটার যত আগ্রহীই হোন না কেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালট ফেরত না এলে সেটি কার্যত বাতিল হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশন নিজেও স্বীকার করছে, ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনার পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি লজিস্টিক পরীক্ষার মতো। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সব নিবন্ধিত ভোটার আদৌ ভোট দেবেন কি না। ১৫ লাখের বেশি নিবন্ধন মানেই ১৫ লাখ ভোট পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেকেই সময়মতো ব্যালট পাঠাতে ব্যর্থ হতে পারেন, আবার কেউ কেউ আগ্রহ হারাতেও পারেন। ফলে পোস্টাল ভোটের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি ব্যালট গণনায় যুক্ত হয়, তার ওপর।
পোস্টাল ভোটের ভৌগোলিক বণ্টনও রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করছে। ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রামের মতো এলাকায় উচ্চসংখ্যক পোস্টাল ভোট থাকায় এসব অঞ্চলে ফলাফল নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে। বিপরীতে যেসব আসনে নিবন্ধিত পোস্টাল ভোটার সংখ্যা কম, সেখানে এর প্রভাব তুলনামূলক সীমিত থাকবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পোস্টাল ভোট বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি পরীক্ষামূলক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি একদিকে প্রবাসী ও কর্মরত নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে নির্বাচনের ফলাফলকে করছে আরও অনিশ্চিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মাত্র ১.২ শতাংশ ভোটই অনেক আসনে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে—এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এবার নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।