জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দুই বিকল্প প্রস্তাবের মধ্যে প্রথমটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সায় থাকার কথা বলেছেন দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।
এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে যে সুপারিশমালা দিয়েছে, তা নিয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নিজেদের অব্স্থান তুলে ধরে। এরপরে তাদের বক্তব্য তুলে ধরে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি লিখেছেন, “এনসিপি মনে করে, প্রথম খসড়া তথা প্রস্তাব-১ বাস্তবায়নের পথে সরকারকে যেতে হবে। কারণ এখানে ৮(ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্য সম্পন্ন করতে না পারলে সংবিধান সংস্কার বিল পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে এবং সংবিধান সংস্কার আইনরূপে কার্যকর হবে।
“সনদের ওপর গণভোটের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা তৈরির লক্ষ্যে এটি একটি অত্যাবশকীয় সুপারিশ যার নজির বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে।”
মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা হস্তান্তরের পর এক ব্রিফিংয়ে সুপারিশের কিছু বিষয় সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ।
সেখানে তিনি বলেছেন, সংবিধান সংস্কারে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম বিকল্প প্রস্তাবের ‘ঘ’ অংশে বলা হয়েছে, “বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে অনুষ্ঠিত গণভোটে যদি ইতিবাচক সম্মতি পাওয়া যায় তাহলে সংবিধান সংস্কার বিলটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ তার দায়িত্ব পালনে সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করবে। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যদি সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।”
হাসনাত লিখেছেন, “অন্যদিকে, কমিশন প্রস্তাবিত প্রস্তাব-২ তে এ ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই যার দরুন গোটা সংস্কার কার্যক্রমই ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে৷
“অর্থাৎ, প্রস্তাব-২ নয়; সরকারকে কমিশন প্রস্তাবিত প্রস্তাব-১ কে বাস্তবায়ন রূপরেখা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।”
এই এনসিপি নেতার ভাষ্য, “প্রস্তাব-১ এর বেশ কিছু জায়গায় ভাষিক অস্পষ্টতা বিদ্যমান যা নিরসন করতে হবে। যেমন ৮ (ক) ধারায় বর্ণিত আগামী নির্বাচিত সভা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবে নয়, ‘করিবে’— এভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।
“৮ (ঘ) ধারায় সংবিধান সংস্কার বিলের বিষয়াদি ‘বিবেচনা করিবে’ এক ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি করে যা দূর করা প্রয়োজন।”
এনসিপির বক্তব্য তুলে ধরে হাসনাত লেখেন, “আমরা বরাবর বলেছি জুলাই সনদ স্রেফ রাজনৈতিক সমঝোতার ফাঁকা বুলি ও দলিল নয়; অবশ্যই এর আইনি ভিত্তি থাকতে হবে৷ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া দেখেই এনসিপি স্বাক্ষরের বিবেচনা করবে—এই ছিল আমাদের বক্তব্য।
“আমরা লক্ষ করেছি এনসিপির আপোষহীন অবস্থানের ধারাবাহিকতায় গতকাল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা সুপারিশ করেছে। আমরা মনে করি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এনসিপির অনড় অবস্থানের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি আমরা ঐকমত্য কমিশনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।”
গণভোট কখন হবে তা নিয়ে বক্তব্য না দিলেও এনসিপি ‘সংবিধান সংস্কার বিল’ খসড়া আকারে ‘দ্রুত প্রণয়ন’ এবং জনগণের সামনে ‘উন্মুক্ত’ করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি সরকারের প্রতি যেসব আহ্বান জানাল তাও তুলে ধরেন হাসনাত।
সেসব হল-
১. ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের প্রথম খসড়াটি (প্রস্তাব-১) গ্রহণ করার মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. সংবিধান সংস্কার বিল খসড়া প্রণয়ন ও উন্মুক্তকরণের উদ্যোগ নিতে হবে৷
৩. জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তিসম্পন্ন আদেশের খসড়া সরকার গ্রহণ করলে সনদ স্বাক্ষরের ব্যাপারে অগ্রগতি তৈরি হবে বলে এনসিপি মনে করে।
দীর্ঘ এক বছরের আলোচনার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয়।
সংস্কার উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে জুলাই সনদে কিছু বলা হয়নি। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতা থাকায় আলাদাভাবে আলোচনা করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ঐকমত্য কমিশন তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।