জাতীয় প্রধান খবর সারাদেশ

আসুন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধে একসঙ্গে কাজ করি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

1443641981নিজস্ব প্রতিবেদক, হটনিউজ২৪বিডি.কম  : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সব রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আসুন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করি। বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নের পথে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস জঙ্গিবাদ প্রধান অন্তরায়। সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম কিংবা সীমানা নেই। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন এক শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ উন্নত বিশ্ব গড়ে তুলি, যেখানে দারিদ্র্য, অসমতা, সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন ও সংঘাত এবং বিদ্বেষ ও বৈষম্য থাকবে না। আসুন, আমাদের সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য
একটি সুন্দর ও নিরাপদ জীবন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়ার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করি।’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক যান। ৭০তম অধিবেশনের বিভিন্ন সেশনে যোগদান ছাড়াও এরই মধ্যে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ ?পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দি আর্থ’ এবং ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) পুরস্কার গ্রহণ করেছেন তিনি। গতকাল রাতে অধিবেশনে বরাবরের মতো বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি নিজে সন্ত্রাস এবং সহিংস জঙ্গিবাদের শিকার। তার পিতা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ভাই ও অন্যান্য নিকটাত্মীয়কে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি নিজেও কমপক্ষে ১৯ বার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ, সহিংস জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে বিশ্বাসী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক মারাত্মক হুমকি। এই চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা না গেলে উন্নয়ন প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। নতুন উন্নয়ন এজেন্ডায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, আমাদের এই ধরিত্রী, এর প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু সংরক্ষণের জন্য সব কার্যক্রম বাস্তবায়নে সবার দৃঢ় প্রত্যয় থাকতে হবে। এ বিশ্বকে নিরাপদ, আরও সবুজ এবং আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে আমাদের অবশ্যই সফলকাম হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই ?উন্নয়ন ত্বরান্বিত এবং শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে সার্ক, বিমসটেক এবং বিসিআইএম-ইসির মতো আঞ্চলিক সংস্থা প্রতিষ্ঠায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, অভিবাসন ও মানব চলাচল আজ নতুনভাবে ইতিহাস ও ভৌগোলিক পরিসীমা নির্ধারণে নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ উন্নয়ন এজেন্ডায় উন্নয়নের জন্য অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপযোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অভিবাসনের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। এ লক্ষ্য সামনে রেখে উৎস ও গন্তব্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে গ্গ্নোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (জিএমইডি) নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও শান্তিনির্মাণ কার্যক্রমে অন্যতম প্রধান শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গর্বিত। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাহসী শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের ৪০টি দেশের ৫৪টি মিশনে নিয়োজিত হয়েছেন। আমরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চসংখ্যক নারী পুলিশ সদস্য নিয়োজিত করার শ্রেষ্ঠত্বও অর্জন করেছি। এ মিশনে বাংলাদেশের অবদান জাতিসংঘের শান্তি অন্বেষায় আমাদের বিশ্বস্ত অংশীদার করেছে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসডিজিতে যে উচ্চাশা প্রতিফলিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আমাদের সরকারি ও ব্যক্তি খাতসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক তহবিলের জোগান অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য উন্নত দেশগুলোর পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের জিএনআইর শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ওডিএ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এবং শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে প্রদান জরুরি। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও বিস্তার এবং অভিযোজনের যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চার দশকের বেশি আগে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার প্রথম বক্তৃতায় ‘শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও আগ্রাসনমুক্ত একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার’ স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সেই উদাত্ত আহ্বান আজও আমাদের জাতীয় উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্পৃক্ততার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা বর্তমানে এমন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এগোচ্ছি, যেখানে দারিদ্র্য, অসমতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির বদলে সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রফতানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ সব ক্ষেত্রের উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল ও সমুদ্র সীমানা সমস্যা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান করা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার রাষ্ট্রবিহীন ছিটমহলবাসী তাদের পছন্দের রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পেরেছেন। এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে শেষ করার মাধ্যমে আমরা বিশ্বের কাছে কূটনৈতিক সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্যও এই বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত ‘উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন’ শীর্ষক শীর্ষ সম্মেলন এবং নিউইয়র্কে সদ্যসমাপ্ত ‘২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলন’ বিশ্বের জনগণের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এ বছরের শেষে প্যারিসে আমরা একটি অর্থবহ জলবায়ু চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, দারিদ্র্য নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তন সীমিত রাখা এবং ধরিত্রীকে সুরক্ষার মাধ্যমে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।