জাতীয় সারাদেশ সাহিত্য

সুকান্ত ভট্টাচার্য : সময়-সাহিত্য আর সংগ্রামের মিথস্ক্রিয়া

express1434098553সাহিত্য ডেস্ক: বাংলা কাব্যসাহিত্যে রবীন্দ্র, নজরুলের পর সুকান্ত ভট্টাচার্যকেই সর্বাধিক উচ্চারিত কবি বলা যেতে পারে। সাহিত্যে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা, রোষ, স্বপ্ন আর সংগ্রাম সবচেয়ে বেশি ধারণ করতে পেরেছিলেনে তিনি। এখনও অবধি, কাব্যচর্চায় তাঁর দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন, এমন কবি সংখ্যা কম নয়।

সুকান্ত ভট্টাচার্যকে অনেক সময় ‘কিশোর কবি’ বলা হয়ে থাকে। এটা ঠিক তিনি মাত্র একুশ বছর পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন। তবে তাঁর জীবন দর্শন ও কাব্যের বিষয়বক্তব্য মোটেই ‘কিশোর মানসিকতা প্রসূত’ ছিল না। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিকদের মতোই সুকান্ত ভট্টাচার্য যুগপৎ কবি ও রাজনৈতিক কর্মী। তিনি কবিতাকে নেহায়েত আয়েশি মানুষের বিকার ফল হিসেবে না দেখে, কবিতা যে গণমানুষের ভাষাকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, রাজপথেও যে পাঠ করা যায়, তা দেখিয়েছেন। বলা যায়, তিনি কাব্য ভাষায় যতটা গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছেন তা অনেক কবিই পারেন নি। যে কারণে তাকে ‘গণমানুষের কবি’ হিসেবে খ্যাত করা হয়। যদিও সমালোচকেরা বলেন, তিনি কবিতাকে স্লোগানে উচ্চকিত করে ফেলেছেন। এই সমালোচনা যে সত্যি নয়, তা তাঁর কবিতার বিষয়বক্তব্য, প্রসাদগুণ, শব্দচয়ন, উপস্থাপন ও আঙ্গিক বিচারেই পরিস্কার।

কাব্যচর্চায় সুকান্ত অগ্রজ হিসেবে পেয়েছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে। তাঁকে তিনি কবিতা দেখাতেন, পরিমার্জন আশা করতেন। এক স্মৃতিচারণে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘কীভাবে কবিতা লিখতে হবে তার জন্য সুকান্ত তাঁর কাছে আসতেন, কিন্তু কী লিখতে হবে সেই সংকট তার কখনোই ছিল না।’

সুকান্তের সাহিত্য আলোচনায় বরাবরই প্রধান্য পায় তাঁর সাহিত্য মানস। সুকান্তের সাহিত্য মানস বিচার করতে গেলে অবশ্যাম্ভাবি সেই সময় আমাদের বিচার করতে হয়। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট (৩০ শ্রাবণ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) মাতামহের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রীটের বাড়িতে, কালীঘাট, কলকাতায় তাঁর জন্ম। কবির পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুর জেলার (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলা) কোটালীপাড়া উপজেলার উনশিয়া গ্রামে। সুকান্তের জন্ম সময়টি ছিল বিশ্ব ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্দ ও ঘটনাবহুল একটি সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকায়নি। এরই মধ্যে জার্মানি, ইতালিতে ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে যথাক্রমে নাৎসিবাদ, ফ্যাসিবাদ। অন্যদিকে কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে সংঘটিত ‘অক্টোবর বিপ্লব’-এর মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন যাত্রা শুরু করেছে।

লেনিনের এই বিপ্লব শোষণমুক্ত গণমানুষের সমাজের স্বপ্নকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ঔপনিবেশিকদের পদানত অঞ্চলগুলোতে গড়ে উঠছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব। বাড়ছে শ্রেণি সচেতনতা। সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে পৃথিবীর দেশে-দেশে গড়ে উঠছে কমিউনিস্ট পার্টি। এই সময় সুকান্তের নিজের দেশ ভারতবর্ষ, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ মুক্ত হতে চাইছে। স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। গড়ে উঠেছে কমিউনিস্ট পার্টি। শৈশব ও কৈশোরে সুকান্ত ভট্টাচার্য এই আদর্শ দ্বারা গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

আমরা দেখি, সুকান্তের পিতা নিবারণ ভট্টাচার্যও ছিলেন পণ্ডিত ও রসঙ্গ মানুষ। যে কারণে তাদের বাড়িতে সাহিত্যের আসর বসতো। ফলে এটা বলা যেতে পারে যে, পারিবারিক এবং দেশিয় ও বৈশ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতিই সুকান্তকে যুগপৎ কবি ও রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত করেছে। কবির ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের দিকে তাকালেও আমরা তাঁর কবি মানসের ক্রম পরিণতি দেখি। মাত্র এগারো বছর বয়সে সুকান্ত তাঁর মা ও জেঠতুতো বোন রানীদি’কে হারান। যে কারণে সুকান্তের প্রথম দিকের রচনায় তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখভারাক্রান্তের ছাপ পাওয়া যায়। কবির অনুজ অশোক ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘প্রকৃতি প্রেম কিংবা ব্যক্তিগত দুঃখবেদনা, এই ছিল সুকান্তের কৈশরের প্রথমদিকের লেখার উপজীব্য।’

তবে সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক বিষয়াদিই তাঁর লেখার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ ও শ্রেণি সচেতনতা মূর্ত হয়ে ওঠে। ১৯৪১ সালে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন এবং ’৪২সালের মধ্যেই তিনি ছাত্র রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আবির্ভূত হন। ‘জনরক্ষা’ সমিতিকে কেন্দ্র করেই তিনি পার্টির প্রচার ও সাংগঠনিক কাজে নিয়মিত যুক্ত থাকেন। ১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ‘শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সেবা-স্বাধীনতা’র আদর্শে যে ‘কিশোর বাহিনী’ নামক সংগঠন গড়ে ওঠে, সুকান্ত ছিলেন ওই দলের নিবেদিত প্রাণ কর্মী। শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে তিনি নিরলসভাবে সাংগঠনিক তৎপরতায় যুক্ত থাকেন। একই সঙ্গে ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে থাকেন।

আমাদের মনে রাখা দরকার, সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ পাওয়া কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না। নিরলস পরিশ্রমের ফসল ছিল তা। সুকান্ত ভট্টাচার্য় মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ১৯৪৪ সালে পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। যার প্রভাব পরে তার শিক্ষা জীবনেও। ১৯৪৫-এ অনুষ্ঠিত প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনি কৃতকার্য হতে পারেন নি। ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় সেখানেই তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

দেখা যায়, পরীক্ষার খাতায় অকৃতকার্য হলেও সাহিত্যের খাতা ক্রমেই ভরে উঠতে শুরু করেছে। পার্টির সদস্য পদ লাভের বছর, অর্থাৎ ’৪৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় ‘আকাল’ নামক একটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবদাহ স্তিমিত হয়ে এলেও ভারতবর্ষে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে মন্বন্তর ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যার অনিবার্য় ফল হিসেবে ইতিহাসে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ খ্যাত ১৯৪৩ সালে দূর্ভিক্ষ, ’৪৭-এর ‘দেশ ভাগ’ খ্যাত সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগের ঘটনা ঘটে। এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সুকান্তের কলম শাণিত হয়ে ওঠে।

সুকান্তের মানস চিন্তা বোঝার জন্য তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথেরে প্রতি’ কবিতাটি বিশেষভাবে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশেষত নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে রবীন্দ্রনাথকে রীতিমতো ‘গুরুদেব’ তথা দেবতার আসনেই বসিয়েছিলেন ভক্ত-অনুরাগীরা। সুকান্তের কাব্যস্ফুরণ সদ্যপ্রয়াত রবীন্দ্র উত্তর সময়েই। এটাও কম কথা নয় যে, সেই সময়ে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘রাবীন্দ্রিক’ উদযাপন-স্মরণের বাইয়ে দেখিয়েছিলেন।
‘আমি এক দূর্ভিক্ষের কবি,
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আমরা বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতিক্ষায়।’

কবিতার সমাপ্তিতে রাবীন্দ্রিক ভাবালুতার উড়িয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট উচ্চারণ করেন-
‘তাই আজ আমারও বিশ্বাস,
“শান্তির ললিত বাণী সুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।”
তাই আমি চেয়ে থাকি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,
দানবে সাথে আজ সংগ্রামে তরে।।’

প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত সুকান্ত সারাজীবন এই দানবের সঙ্গেই লড়াই করে গেছেন। আসলে তিনি তার সময়কে ভালভাবে চিনেছিলেন। সময়ের আহবানে সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি চান নি এই সব এড়িয়ে ভাবালুতার গলিপথে হারিয়ে যেতে।

সুকান্তের বহুল পঠিত ও জনপ্রিয় কবিতা ‘হে মহাজীবন’। আজকের বাস্তবতায় সহজ হলেও, চাঁদকে ঝলসানো রুটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কাব্যিক বাস্তবতা সুকান্তই তৈরি করেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ত্রিশের দশকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক পাঁচ কবির আবির্ভাব ঘটেছে। তা ছাড়া আরো অনেক বড় বড় কবি তখনও সাহিত্যের ফসল ফলিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সাহিত্যে তাদের রোমান্টিকতার বাইরে সুকান্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে অরেক বস্তবতায় আমাদের প্রবেশ করিয়ে দেন। কবিতায় লিখেন-
‘প্রয়োজন নেই, কবিতা স্নিদ্ধতা
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রূটি।’

এখানে সুকান্তের পূর্ণমানস ও চিন্তার পরিপক্কতা ফুটে ওঠে। যে কারণে আবির্ভাবের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য সুকান্তকে আশ্চর্য প্রতিভা বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে তিনি সবটুকু মেলে যেতে পারেন নি। পারলে তাঁর কাছে ভিন্ন আঙ্গিকের কবিতাও পেতাম। তাঁর কবিতা ক্রমেই ভিন্ন আঙ্গিকে দিকে যাচ্ছিল। শেষ দিনগুলোতে তিনি খানিকটা কাহিনীর আকারে লিখেন ‘একটি মোরগের আত্মকাহিনী’, ‘চারাগাছ’- এগুলো তারই উদারহণ। কিন্তু ঠিক বিকশিত হওয়ার মুখেই সেই আশ্চর্য প্রতিভাকে আমরা হারিয়েছি।

সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। তখন বিভিন্ন স্থানে এর শাখাও গড়ে উঠেছিল। তাই পার্টির কাজ, নিজস্ব লেখালেখির পাশাপাশি শাখার কমরেডদের প্রচুর চিঠি ও পোস্ট কার্ড লিখতেন। এ দিকটি খেয়াল করলে ও চিঠি পড়লে দেখা যায়, তিনি শুধু নিজে কবি হতে চান নি, চেয়েছিলেন সবার ভেতরই সুকুমার ‍বৃত্তির স্ফুরণ ঘটুক। তাঁর পার্টি কার্যক্রম, লেখনি থেকে অনুমিত এই সিন্ধান্তে আসা যায় যে, তিনি শুধু কবিতার উর্বর ফসলই চাননি। তিনি কবিতার একটি সমাজ চেয়েছিলেন।