জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর লাইফ স্টাইল

মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্ধকার দূর করার প্রত্যয়ে

ramna-18 আফিফা জামান,হটনিউজ২৪বিডি.কম,ঢাকা,চারুকলা অনুষদ থেকে: বিশাল হাতের থাবা। যার একটি আঙ্গুল লাল। এ লাল রং সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতীক। এই হাতের পাঞ্জা মানুষের গলা চেপে ধরার মতো করেই উপস্থাপিত। ২৫ ফুট উচ্চতার এই স্থাপনাটি এগিয়ে চলছিল আর কথা হচ্ছিল চারুকলা অনুষদের ছাত্র লিটন পালের সঙ্গে। বললেন, ‘এ স্থাপনার মধ্য দিয়ে আমরা সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলছি।’

দেশের বিগত তিন মাসের সহিংসতা আর ধর্মরক্ষার নামে যে সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন উল্লম্ফন চলছে চারপাশে তারই প্রতিবাদ উঠে এলো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায়। নানা শ্রেণী, পেশা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষ এতে অংশ নেন।

মানিক বন্দোপাধ্যায় থেকে ধার করা পঙক্তি ‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’-এ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন থাইল্যান্ডের সংস্কৃতিমন্ত্রী উইরা রাজপুট চানারাত।

শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক, চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সর্বস্তরের মানুষ।

এবারের স্থাপনার মধ্যে আরো রয়েছে পায়রা, কাকাতুয়া, মাছ, ঘোড়া, বাঘ। বিশেষ আর্কষন হিসেবে ছিল একটি ছাগল ও তার দুইটি ছানার স্থাপনা। যার মধ্য দিয়ে তুলে ধরে হয়েছে গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধিকে। কারণ, গ্রাম বাংলায় সমৃদ্ধির আশায় ছাগল মানত করে কোরবানি দেওয়া হয়। সেই বিষয়টিকে সামনে রেখেই এই স্থাপনাটি তৈরি হয়েছে।এছাড়াও ২৮ ফুট উচ্চতার একটি টেপা পুতুল রয়েছে শোভাযাত্রায়। যেখানে কলসি হাতে নিয়ে মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তবে আকৃতি বড় হওয়ায় এটি শোভাযাত্রায় অংশ না নিয়ে চারুকলা অনুষদের সামনের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এবারের বেশিরভাগ স্থাপনাতেই প্রধান অনুসঙ্গ হিসেবে রাখা হয়েছে শিশুদের আকৃতি। এর কারণ হিসেবে উদ্যোক্তারা জানান, বাচ্চারাই সকল আনন্দের মূল অংশীদার। সে বিষয়টিকে খেয়াল রেখেই আনন্দের প্রতীক হিসেবে অধিকাংশ স্থাপনাতেই বাচ্চাদেরকে রাখা হয়েছে। এসবের মাঝেও বিশাল শোভাযাত্রায় আরো রয়েছে বিশালাকৃতির হাতি। যা ভারতীয় উপমহাদেশের বরেণ্য শিল্পী যামিনী রায়ের মোটিভ থেকে তৈরি করা হয়েছে। আরো রয়েছে রাজা-রানী, উজির-নাজির, বাঘ, পেঁচা, টেপা পুতুলসহ নানা লোকজ মোটিভের মুখোশ ও প্ল্যকার্ড। এসব মুখোশ ও প্লাকার্ড নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন ছেলে-বুড়ো সবাই।

এবারই প্রথম শোভাযাত্রাকে আরো বর্নিল করে তুলতে আকাশ পথ থেকে অংশগ্রহণকারীদের উপর লাল-সবুজের কাগজের টুকরো ছুঁড়ে ফেলা হয়। এর পাশাপাশি হাতে ও মুখে মুখোশ ধারণ করে শিশুরা শোভাযাত্রায় উড়িয়েছে ঘুড়ি। হাতে বড় বড় মুখোশের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিলো কাগজের পাখি, পুতুল, চড়কা।

সঙ্গত, ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বের করা হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। সে বছরই লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়
এই আনন্দ শোভাযাত্রা। প্রথম শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। তারপরের বছরে চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। এ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। এরপর থেকে এই শোভাযাত্রা বাংলা বর্ষ বরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তবে প্রথম দিকে এর নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে নামকরণ করা হয়।