অপরাধ জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর

গরু মোটাতাজাকরণ ব্যাধিতে খামারিরা

 নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. ফরহাদুল আলম জানিয়েছেন, ক্ষতিকর ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মোটাতাজা করা গরু কোরবানির হাটে তোলা হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য আসন্ন ঈদুল আজহায় প্রতিটি গরুর হাটে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে গরুর রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। যদি কোনো গরুর রক্ত পরীক্ষায় বিষাক্ত কিছু ধরা পড়ে, তাহলে সেই গরু সিল মেরে বিক্রেতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  খুবই ভালো উদ্যোগ সন্দেহ নেই। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাধার আগেতো সরষের ভূত তাড়াতে হবে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে গরু মোটাতাজাকরণে অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে পাম ট্যাবলেট, স্টেরয়েড ও ডেক্সামেথাসনের মতো ভয়ানক ক্ষতিকারক ওষুধ। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এরই মধ্যে এই অসাধু প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেশি লাভের আশায় অনেক খামারি পশুচিকিৎসকদের পরামর্শ না মেনেই গরুকে স্টেরয়েড দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই হাতুড়ে চিকিৎসক ও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্ররোচনায় পড়ে বিষাক্ত রাসায়নিকের হাই ডোজ প্রয়োগ করে অল্পদিনে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তাজা করা হচ্ছে গরু। এসব গরুর মাংস খেলে লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্তসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজাকরণের এই প্রক্রিয়া চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভয়ঙ্কর বিষাক্ত খেলায় মেতে উঠেছেন একশ্রেণীর অতিলোভী ব্যবসায়ী। ঈদের দুই থেকে তিন মাস আগে অল্প টাকায় শীর্ণকায় গরু কিনে তারা বিষাক্ত হরমোন, ইনজেকশন ও রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করে মোটাতাজা করছেন। এসব গরু ঈদের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাই না করা হলে মরে যায়। কারণ, গরুর শরীরের পরতে পরতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় স্টেরয়েড, হরমোন কিংবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর সব রাসায়নিক দ্রব্য।

প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরুকে নিয়মমাফিক স্বীকৃত ফর্মুলা অনুসারে খাদ্য দিয়ে মোটাতাজা করলে তার মাংস ক্ষতির কারণ হয় না। কিন্তু স্টেরয়েড দিয়ে মোটা করা গরুর মাংস ক্ষতিকর। স্টেরয়েড মূলত হাঁপানির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ জাতীয় ওষুধ, যেমনথ ডেক্সামেথাসন বা ডেকাসন, বেটামেথাসন ও পেরিঅ্যাকটিন অতিরিক্ত মাত্রায় দিলে গরুর কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ায় শরীর থেকে পানি বের হতে পারে না। এ কারণে শোষিত হয়ে পানি সরাসরি গরুর মাংসে চলে যায়। ফলে গরুকে মোটা দেখায়।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানায়, গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত পদ্ধতি। এটি একটি স্বল্পমেয়াদি লাভজনক পদ্ধতি। প্রাকৃতিক এ পদ্ধতি যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। যুব উন্নয়ন অধিদফতর ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতর থেকে গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে গরু মোটাতাজা করে হাজার হাজার বেকার যুবক স্বাবলম্বী হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ এ জন্য গরুচাষিদের দুই থেকে আড়াই কেজি বিশেষ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত ইউরিয়া, লালিগুড় ও খড়ের একটি বিশেষ ধরনের মিকচার খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়। আট দিন কোনো পাত্রে এ মিকচার বন্ধ করে রেখে তা রোদে শুকিয়ে গরুকে খাওয়াতে হয়। তিন মাস ধরে এটা খাওয়ালে গরু খুব দ্রুত মোটাতাজা হয়ে ওঠে। অথচ কিছু পশুচিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত মোটাতাজা করতে ক্যাটাফস, বার্গাফ্যাট, বায়োমিঙ্গ খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্ষতিকর নানা ওষুধ ও রাসায়নিক সেবনের মাধ্যমে এখন গরু মোটাতাজা চলছে। এ বছর দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতেই অন্তত এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের আড়াই লক্ষাধিক গরুকে অবৈধ পন্থায় মোটাতাজাকরণ করার পরিকল্পনা নিয়েছেন চাষিরা। সিরাজগঞ্জেও লক্ষাধিক ষাঁড় মোটাতাজা করে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক ডা. মাহবুব আলী খান বলেন, `আমাদের দেশে সাধারণত বিক্রয়যোগ্য গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ কাজে স্টেরয়েড আইটেমের ডেক্সামেথাসন গ্রুপের বিভিন্ন ইনজেকশন প্রয়োগ হয়ে থাকে। এ ছাড়া ইউরিয়া খাওয়ানো হয়। মুখেও বিভিন্ন ধরনের উচ্চ মাত্রার ভিটামিনের মিশ্রণ খাওয়ানো হয়। কোরবানির আগে এ প্রবণতা বেড়ে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, স্টেরয়েড আগুনের তাপেও নষ্ট হয় না। ফলে যেসব গরুকে পাম ট্যবলেট, ডেক্সামেথাসন ও স্টেরয়েড খাইয়ে মোটাতাজা করা হয়, সেগুলোর মাংস খেলেও মানবদেহে মরণঘাতি সব রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, কোরবানীর হাটের গরুগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায় এগুলো প্রাকৃতিকভাবে নয়, কৃত্রিমভাবে মোটা করে বাজারে তোলা হয়েছে। তাছাড়া, প্রাকৃতিকভাবে শক্তি-সামর্থ্যরে কোনো গরু যেমন তেজি ও গোয়ার প্রকৃতির হয়, এই গরুগুলো হয় তার ঠিক উল্টো। ধীর ও শান্ত স্বভাবের এসব গরুর শরীরে ও আচরণে কোনো তেজি ভাবই দেখা যায় না।

স্টেরয়েড খাওয়ানো গরু চেনার উপায় কী জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. বায়েজিদ মোড়ল বলেন, এসব গরু অসুস্থতার কারণে সব সময় নীরব থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটা করা এসব গরুকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়।

মোটাতাজা গরুর মধ্যে পাবনা ব্রিড, অস্ট্রেলিয়ান-ফিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ানা ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড, হেমাটোপিনসহ কিছু পরিচিত জাত রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় ব্রিডিং পদ্ধতি, যা লোকাল ক্রস ব্রিড নামে পরিচিত। এসব ব্র্যান্ডের সব গরুই মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় বড় করা হচ্ছে। ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করেছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইরের আছিমপুরের এক খামারি। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে ১৫টি গরু কিনেছেন। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শমতো তিনি অনেক দামি ইনজেকশন, ট্যাবলেট ও পাউডার ওষুধ খাওয়ানো শুরু করেছেন। তার খামারে গরুকে ক্যাটেল কেয়ার, ইনজ্যাইভিট, এনোরা, সেটরন ইত্যাদি ওষুধ খাওয়ানো হয়ছে বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রাণিসম্পদ বিভাগের ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গামেথাথন জাতীয় ওষুধ পশু বা মানুষকে খাওয়ালে এক সপ্তাহের মধ্যে মোটাতাজা হবে। তবে এই মোটাতাজা বেশি দিন স্থায়ী হয় না, বড়জোর দুই থেকে তিন মাস। আর এই ডেঙ্গামেথাথন গরুকে খাওয়ালে আর সেই গরুর মাংস মানুষ খেলে লিভার, কিডনি, ক্যান্সার, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্তসহ ভয়ঙ্কর কিছু হতে পারে।