অপরাধ জাতীয় ঢাকা

সুজন হত্যা মামলা: ওসি সালাহউদ্দিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু

 আদালত প্রতিবেদক: মিরপুর থানায় পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন করে ঝুট ব্যবসায়ী মাহাবুবুর রহমান সুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মিরপুর থানার ওসি সালাহউদ্দিন আহমেদসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আশিকুর রহমান এ তদন্ত শুরু করেছেন। প্রথম দিনে তদন্তের শুরুতেই মামলার বাদিনী নিহত সুজনের স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি জবানবন্দি দিচ্ছেন। অন্যদের মধ্যে জবানবন্দি দিতে এসেছেন সুজনের মা শাহিদা বেগম, বড় ভাই নজরুল ইসলাম শামীম এবং আত্মীয় মিনহাজ, সাইফুল আলম ও মাহবুবুল আলম। জবানবন্দি দিতে এসে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়লে আদালত চত্ত্বরের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিহত সুজনের স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি ও মা শাহিদা বেগমের আহাজারিতে উপস্থিত সকলের হৃদয় ছুয়ে যায়। তারা কান্নাজড়িত বলছিলেন, পুলিশ যদি সুজনকে হত্যা না করে তার বিরুদ্ধে মামলা দিতো, তাহলেও আদালতে বা কারাগারে তাকে দেখতে পেতাম। গত ২০ জুলাই ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে নিহত সুজনের স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি এ মামলাটি দায়ের করেছিলেন। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩ এর ১৫ ধারায় তিনি এ মামলাটি দায়ের করেন। ওইদিন বিচারক মো. জহুরুল হক সুজন হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে ঢাকার সিএমএম বিকাশ কুমার সাহা বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আশিকুর রহমানকে নিয়োগ দেন। মামলার আসামিরা হলেন, মিরপুর থানার ওসি সালাহউদ্দিন আহমেদ, এসআই জাহিদুর রহমান ওরফে জাহিদ, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রাজকুমার, কনস্টেবল আসাদ ও রাশেদুল, জনৈক মিথুন, নাসিম শেখ, ফয়সাল, খোকন ও পলাশ। গত ১৩ জুলাই  হাজারীবাগ থানার পশ্চিম জাফরাবাদের বাসায় অভিযান চালিয়ে সুজনকে আটক করে মিরপুর থানায় নিয়ে আসেন এসআই জাহিদ। এরপর রাত অনুমান সোয়া বারটা থেকে ভোররাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নিজেদের হেফাজতে রেখে তাকে নির্যাতন করেন। ফলে আটক মাহবুবুর রহমান সুজনের মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাকে বাসায় ও থানার একটি কক্ষে আটকে রেখে বেধড়ক পেটানো হয়। ভোরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।  মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গত ১৩ জুলাই রাত সোয়া ১২টায় বাদিনীর ভাড়া বাসায় বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে কথা বলার মিথ্যা অজুহাতে দরজা খুলতে বলেন। দরজা খুললে এসআই  জাহিদুর রহমান জাহিদ, এএসআই রাজ কুমার, কনস্টেবল আসাদ, রাশেদুল ও মিথুনরা ঘরে ঢুকে সুজনের নামে মামলা আছে বলে বাসা তল্লাশি করেন।
এরপর এসআই জাহিদ তার পকেট থেকে একটি পিস্তল ও দু’টি ম্যাগজিন বের করে বাদীনির খাটের ওপর রাখেন। বাদিনী তাতে বাধা দিলে এসআই জাহিদ তাকে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলেন। অন্যথায় তাকেও অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশ দেখে সুজন তখন ভয়ে রান্না ঘরের সানসেটে লুকিয়ে থাকেন। এএসআই রাজকুমার তাকে সানসেট থেকে নামিয়ে আনেন।
এরপর আসামিরা গামছা দিয়ে সুজনের চোখ বেঁধে দুই হাত পিছন নিয়ে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে রশি দিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে টেনে বাথরুমে নিয়ে বালতি ভরা পানিতে নিহতের মাথা ডুবিয়ে শরীরের অন্য অংশে লোহার রড দিয়ে বেদম পেটাতে থাকেন।
এ সময় সুজনের পাঁচ বছরের শিশুপুত্র মোশারফ জাহিদের পা ধরে তার বাবাকে না মারার জন্য কান্নাকটি করলে এসআই জাহিদ শিশু মোশারফকে সজোরে লাথি মেরে সরিয়ে দেন। এতে শিশু মোশারফ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এরপর তারা সুজনের স্ত্রীর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাকে মারধর করেন এসআই জাহিদ।
পরে জাহিদ বাদিনী, তার স্বামী ও শিশুপুত্রকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দু’টি মোবাইল ফোন, আলমারিতে রক্ষিত নগদ বিশ হাজার টাকা, দুই লাখ টাকা মূল্যমানের গলার স্বর্ণের চেন, হাতের বালা, নাকের নথসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে বাদিনী, তার স্বামী ও শিশুপুত্র মোশারফকে রাত অনুমান পৌনে দুটায় মিরপুর থানায় নিয়ে যান।
বাদিনী তার মামলায় উল্লেখ করেন, এ সময় এসআই জাহিদ তার ওয়্যারলেসে স্যার সম্বোধন করে বলেন, ‘হারামজাদাকে মারতে মারতে নিয়ে এসেছি, এখন কি করবো? অপর প্রান্ত থেকে জবাব আসে, ‘ক্লোজ করে দাও না হয় ফাইনাল করে দাও’।
এরপর বাদিনী ও তার শিশুপুত্রকে একটি কক্ষে আটক রেখে তার স্বামীকে আলাদা কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করতে থাকেন এসআই জাহিদসহ অন্যরা। এ সময় বাদিনী তার স্বামীর আর্তচিৎকার শুনতে পান এবং স্বামীর জন্য কান্নাকাটি করতে থাকেন। এর কিছু সময় পর বাদিনী আর তার স্বামীর কোনো সাড়া শব্দ শুনতে পাননি।
এরপর ওসি সালাউদ্দিন সকাল অনুমান ৯ ঘটিকার সময় বাদিনী ও তার শিশুপুত্রকে তার রুমে নিয়ে এসে জানান, তার স্বামী গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে বাসায় রেখে আসেন।