রাজনীতি

ভাঙনের ফাঁদে ১৯ দল!

ঢাকা, ৩১ মার্চ (হটনিউজ২৪বিডি.কম) : প্রায় তিন বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা ১৮ দলীয় জোট ১৯ দলে উন্নীত হওয়ার পর এবার ভাঙনের সুর বাজছে সেই জোটে। শরিকদের প্রতি বিএনপির অবহেলা এবং যথাযথ সম্মান না দেখানোসহ বেশ কিছু ইস্যুতে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

সেই সঙ্গে সরকারের লোভনীয় ‘অফার’ ভাঙনের পক্ষে শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে কাজ করছে বলে জোটসূত্রে জানা গেছে। সোমবার ১৯ দল থেকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ ভাসানী বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট আবারও ১৮ দলীয় জোটে রূপ নিল।

আগামী এক মাসের মধ্যে জোটের আরো কয়েকটি দল বের হয়ে যেতে পারে বলেও জোরালো গুজব রয়েছে জোটের মধ্যে।

জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ ভাসানী) সভাপতি শেখ আনোয়ারুল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘কোনো বিরোধের কারণে নয়, দলকে এককভাবে সংগঠিত করতেই ১৯ দলীয় জোটে থাকছি না। সারা দেশে থাকা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারীদের মতামত নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

তবে একসময় তার কণ্ঠে অভিমান ঝরে পড়ে। তিনি বলেন, ‘এত দিন তো জোটে থাকলাম। এখন জোটের বাইরে এসে দলকে সংগঠিত করতে চাই। তা ছাড়া উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতা হচ্ছে না। তাদের (বিএনপি) কোনো ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও নেই। ছোট দল হিসেবে তাদের সঙ্গে তো আমরা পাল্লা দিতে পারি না। এজন্য সংগঠন জোরদার করার দিকেই নজর দিতে চাই।’

জোট সূত্র জানিয়েছে, ১৯ দলীয় জোটে অনেক আগে থেকেই ভাঙনের সুর বাজছে। কিন্তু জোটের প্রতি শরিক দলগুলো অটল থাকায় বিশেষ কোনো অঘটন ঘটেনি। এজন্য নির্বাচনের আগে শরিকদের কাছে লোভনীয় প্রস্তাব এলেও তৎকালীন ১৮ দল ভাঙেনি। কিন্তু গত কয়েক মাসে শরিকদের সঙ্গে কোনো সমন্বয়ই রক্ষা করেনি বিএনপি। ত্যাগের বিনিময়ে কোনো প্রাপ্তিই নেই তাদের। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ জোটের শরিকরা।

ওই সূত্র আরো জানায়, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময় থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত ১৯ দলের আন্দোলনে শরিকদেরও ব্যাপক অবদান আছে। বিএনপি নিজের দলের হত্যা ও গুম হয়ে যাওয়া নেতা-কর্মীদের তালিকা করলেও জোটের সম্মিলিত কোনো তালিকা করার কথা তারা বলেনি। তা ছাড়া জাগপার একজন নেতা ওই আন্দোলনে নিহত হলেও কখনো তার অবদান স্বীকার করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কোনো বিবৃতি বা বক্তৃতা দেয়নি।

এমন অনেক ঘটনার মিশ্রণে জোটের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। তা ছাড়া ৫ জানুয়ারি ১৮ দলীয় জোটে কাজী জাফরের আগমন ভালো চোখে দেখেনি জোটের শরিকরা। কারণ, কাজী জাফরকে জোটে নেওয়া-না-নেওয়ার বিষয়ে প্রত্যক্ষ কোনো মতামত দিতে পারেনি জোট শরিকরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১৯ দলের একজন শীর্ষ নেতা রাইজিংবিডিকে জানিয়েছেন, শরিক দল হিসেবে বিএনপি জোটকে সেভাবে মূল্যায়ন করছে না। এমনকি ১৯ দলের মহাসমাবেশ থেকে শুরু করে কোনো কর্মসূচিতে শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন থাকে না। ছোট দল হয়েও শরিকরা অর্থ ও শারীরিক পরিশ্রম ব্যয় করে। কিন্তু এর কোনো মূল্য নেই বিএনপির কাছে।

তা ছাড়া বিএনপির মহাসচিব সম্প্রতি বলেছেন, এখন যে জোটটি আছে সেটি আন্দোলনের জোট নয়। ওই নেতা প্রশ্ন করেন, ‘আন্দোলনে যারা জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করল, তারা নির্বাচনী জোটের অংশীদার নয় কেন?’

১৯  দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সরকারও ১৯ দলীয় জোট ভাঙনে রসদ জোগাচ্ছে। বিশেষ প্রস্তাবের পাশাপাশি থাকছে মোটা অঙ্কের টাকার হাতছানি। এ ছাড়া ১৯ দলের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় নেতার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রিত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এই অফারে তালিকায় আছেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গনি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা।

তবে জোটে থাকা ডেমোক্রেটিক লীগ, পিপলস পার্টি, জমিয়তে উলামা ইসলাম বাংলাদেশের মতো দলগুলো বের হয়ে যাওয়ার জোরোলো সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করছে সূত্রটি। তা ছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসনসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলে আসছেন ১৯ দল ভাঙতে সরকার ষড়যন্ত্র করছে।

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে ন্যাপ ভাসানীর বের হয়ে যাওয়া এবং জোটে ভাঙনের সুর সম্পর্কে কোনো কথা বলতে চাননি বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। জানতে চাইলে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখানো কিছু জানতে পারিনি।’ তিনি ঢাকায় থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। দলের অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে প্রশ্ন করা হলে তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে দলের নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, এমন একজন নেতা বলেন, সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তাই দল ভাঙার বা জোটের কাউকে কাউকে ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা তারা করতেই পারে। কিন্তু কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

ওই নেতা আরো বলেন, সরকার সব সময় দল ভাঙার চেষ্টা করে। ফখরুদ্দীনের সময়ও অনেক নেতাকে নিয়ে দল ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি। তবে জোটের প্রতি আনুগত্য না থাকলে এবং চলে যেতে চাইলে তাকে ধরে রাখা যাবে না বলে মন্তব্য তার।

তবে জোটের আপৎকালে ন্যাপের বের হয়ে যাওয়া সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অপর শরিক দল লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। জোটের ঐক্য অটুট আছে দাবি করে রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘ন্যাপের চলে যাওয়া তাদের একান্ত নিজেদের বিষয়। কিন্তু এভাবে এই সময়ে যাওয়া সঠিক হয়নি। শত্রুপক্ষের ইন্ধনে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে জোটের মধ্যে ক্ষোভ আছে। কিন্তু সেগুলো অতিক্রম করে জোটকে এগিয়ে নেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

২০১১ সালে ১৮ এপ্রিল কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।

এরপর চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এই জোটের যোগ দিলে তা ১৯ দলীয় জোটে পরিণত হয়। এখন দল আবার একটি কমে গেল।

বর্তমানে জোটে থাকা দলগুলো হচ্ছে : বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ লিবারেল পার্টি (এলডিপি), জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), লেবার পার্টি, মুসলিম লীগ, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, পিপলস লীগ, জমিয়তে উলামে ইসলাম ও ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল)।