সাহিত্য

বিশিষ্ট কবিদের কবিতা নিয়ে ‘কচক্র’

সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিবেদক, ৩০ মার্চ (হটনিউজ২৪বিডি.কম) : আজকের এই কবিতা চক্রে যাদের কবিতায় সজ্জিত হচ্ছে এই পাতাটি তাদের মধ্যে আছেন আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, বীথি চট্টোপাধ্যায় এবং অরুণাভ সরকার। আসাদ চৌধুরী (জন্ম ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার পদচারণা। কবিতা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু শিশুতোষ গ্রন্থ, ছড়া, জীবনী ইত্যাদি রচনা করেছেন। কিছু অনুবাদকর্মও তিনি সম্পাদন করেছেন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তার রচিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শীর্ষক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। রফিক আজাদ, (জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১) টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ওখানের ষাট শতাংশ অধিবাসী ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত (সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি) ছেলেমেয়েরাই ছিল রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। পরবর্তী সময়ে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, সাহিত্য মনা ও আড্ডাপ্রিয় মাঈন উদ্দিনের পরিচয়েই হয়তো সাহিত্যের সঙ্গে আজাদের সখ্যতা শুরু হয়। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধেও অন্ধগ্রহন করেন। বাংলা একাডেমীর মাসিক সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার, রোববার পত্রিকাতেও সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। নুরুল হুদা (১৯৪৯) সত্তর দশকের একজন বাংলাদেশী প্রথিতযশা কবি। একই সঙ্গে তিনি একজন ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য-সমালোচক এমনকি কথাসাহিত্য, মননশীল রচনা, অনুবাদ, লোকসাহিত্য, মেধাস্বত্ব ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে লেখেন। কুশলী সাহিত্য সংগঠক জনাব হুদা বর্তমানে বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব ও নান্দনিক কবিতা-আন্দোলন কবিতাবংলা-র সভাপতি। এবং তিনিই দরিয়ানগর কবিতামেলার প্রবর্তক। আরও দুজন, যাদের কবিতা থাকছে তারা হচ্ছেন, বীথি চট্টোপাধ্যায় ও অরুণাভ সরকার।

আসাদ চৌধুরী

দশটি প্রদীপ জ্বালো
কোলে-কাঁখে কখনো দেখিনি
চার চরণের ব্যবহারও নেই,
উল্লসিত মাতৃকুল চোখ ঠেরে বলেননি
‘ও রে ভাঁদর ফিরে চা।’
শুরু থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা দিগন্তের দিকে।
আগে-পিছে নার্সিসাস হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।
কোরাসের দলে নেই, শুধু মেঘ একাই বলেছে
দগ্ধ দেহে প্রতিধ্বনি গুনগুন করে, ‘যাব, যাব’।
লাঠি ফেলে, ঘৃত ঢেলে, সোনার মেয়েরা
দশটি প্রদীপ জ্বালো আলো দেখি প্রবল প্রচুর।

রফিক আজাদ

তখন স্বপ্ন ছিলো দুচোখে অনেক
আমরা আগুনমুখা নদীর তলদেশ থেকে
সাঁতরে উঠে এসেছিলাম –
আমাদের এই উত্থান তখন অবশ্য অনিবার্য ছিলো :
দুঃসময়ে উঠে এসে আমাদেরও ওই
পায়ের নিচের মাটি খুব ভালোবেসেছিলাম –
অনন্তর হাতে হাত ধরে
মানববন্ধন করে সামনে এগোতে চেষ্টা করেছি,
– এগোনো কি যায়? কতো যে ঝড়ঝঞ্ঝা,
বাতাসের অবিশ্বাস্য গতিবেগ, বিরুদ্ধ বিষম স্রোত –
বিভিন্ন নৌপথে, ডাঙাতেও আগ্নেয়ঝড়,
মাইল-মাইলব্যাপী শস্যের প্রান্তর জ্বলছিলো,
সেই সে আগুন নেভাতে আগুনেরই মধ্যে
অন্তহীন আগুন হয়ে আমরা পেরিয়েছি
তেপান্তরের পথ,
তীব্র হিংস্র খল সব জলের স্রোতের বিপরীতে
আমরা উজিয়ে উঠে পৌঁছি প্রার্থিত ডাঙায় –
বাতাসের তীব্র গতিবেগ পরাস্ত করে অবশেষে
গন্তব্যে তো পৌঁছেছিলাম…
কিন্তু বন্যা, ঝঞ্ঝাবাতে, বিক্ষুব্ধ গর্কিতে, জলোচ্ছ্বাসে,
মারী ও মড়কে, অগ্নিঝড়ে, মঙ্গায় পীড়িত জন
দৃঢ়পায়ে দাঁড়ানোর কোনো ঠাঁই-ই তো পেলাম না!
তা-হলে কি জন্মাবধি প্রাণান্তকর দুঃখজয়ী
ওই প্রচেষ্টাটি আমাদের প্রিয় স্মৃতিভান্ডারেই
জমা থাকলো!

মুহম্মদ নূরুল হুদা

মানুষ মূলত যোদ্ধা
জন্ম যদি প্রাকৃতিক, মৃত্যু কেন প্রাকৃতিক নয়?
মানুষ মূলত যোদ্ধা, মানুষের নেই পরাজয়।
প্রকৃতির মুখোমুখি চিরকাল অতিপ্রাকৃতিক
হন্তারক জীবেদের দন্তনখ অতিদানবিক
ক্ষুধার দোহাই তুলে যত্রতত্র হাড়মাংস খায়
ত্রিভুবনে অন্যসব প্রাণী-অপ্রাণীর;
না, তাদের তো নেই কোনো দায়
আকাশপাতাল জুড়ে সৃষ্টিসাম্য অটুট রাখার;
ক্ষমতার ক্ষুধা-মুখে এ-ব্রহ্মা ­- তাদের আহার।
নিরীশ্বর নয় তারা, বন্ধু তারা শুধু শয়তানের,
ঈশ্বরের নাম নিয়ে তারা সব প্রতিদ্বন্দ্বী খোদ ঈশ্বরের;
বাঘ বা ভালুক নয়, সাপ নয়, হিংস্র কোনো পশু নয় তারা –
মনুষ্যসুরতধারী, তারা কেউ মনুষ্যত্ব দেয় না পাহারা;
ভোজালি, কুঠার, ছুরি, গুপ্ত সব মারণাস্ত্র হাতে
মানুষ, বৃক্ষ ও প্রাণী হত্যা করে নিশীথে বা প্রাতে;
তারা সব হতে চায় মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী অগ্নি-অধীশ্বর,
স্বর্গে-মর্ত্যে-ত্রিভুবনে নেই কোনো প্রাকৃতিক ঘর।
মানুষেরা প্রেম-জাত; শস্য, মাটি, সমতা ও মমতার প্রকৃত সাধক।
অমানুষ ঘৃণা-জাত; চিরকাল জনযোদ্ধা মানুষের ঘোষিত ঘাতক।
ঘৃণা ও প্রেমের যুদ্ধ, এই যুদ্ধ ঘাতকে-মানবে –
মমতা ও ক্ষমতার এই যুদ্ধ, এই যুদ্ধ মানবে-দানবে।
এই যুদ্ধ জন্মযুদ্ধ, এই যুদ্ধে গণযোদ্ধা চিরমৃত্যুঞ্জয়;
মানুষ প্রাকৃত যদি, মানুষেরই প্রকৃত বিজয়।

বীথি চট্টোপাধ্যায়

গীতাঞ্জলি
একটি কথা সবাই জানি, মুখেও বলি
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন গীতাঞ্জলি।
গীতাঞ্জলি ছাড়লে লোকে কোথায় যাবে?
জীবনদায়ী এমন লেখা আর কি পাবে?
সত্যি ক-জন মনের জোরে বলবে বলো?
দুঃখ থেকে শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলো।
ভয় পেয়ো না, যা বলছে তা বলুক লোকে
নিজের জীবন দেখতে শেখো নিজের চোখে।
পদ্মাপারে গাছের ছায়া নদীর জলে;
সূর্য উঠে নতুন করে লিখতে বলে –
ধুলো উড়িয়ে ঝড়ের মতো দু-চারটি গান
দিনের শেষে ফেরত দেবে সব অপমান,
পুরনো কথা; নতুন করে আবার বলি
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন গীতাঞ্জলি।

অরুণাভ সরকার

স্বচ্ছ কাচ
প্রজাপতি মাথা কোটে জানালার কাচে
প্রজাপতি স্বচ্ছতা জানে না
স্বচ্ছতা জানে না বলে মাথা কোটে
ভাবে, ওই তো রয়েছে তার কাঙ্ক্ষিত আকাশ
এক্ষুনি সে উড়ে চলে যাবে।
আকাশ আকাশে থাকে
জানালায় থাকে স্বচ্ছ কাচ
প্রজাপতি মাথা কোটে স্বচ্ছতায়, কাচে
প্রজাপতি স্বচ্ছতা জানে না বলে মাথা কোটে।
প্রজাপতি মাথা কোটে জানালার কাচে।