আন্তর্জাতিক হটনিউজ স্পেশাল

যে সাহাবির লাশ মাটি গিলে ফেলেছে

হটনিউজ ডেস্ক:

খুবাইব ইবনে আদি ইবনে মালিক (রা.) ইসলামের জন্য শূলে চড়ে শাহাদাতবরণকারী সর্বপ্রথম মনীষী।

চতুর্থ হিজরির সফর মাসের প্রথম দিকে সংঘটিত হয় রাজিয়ের ট্র্যাজেডি। তখন তিনি ‘হুজাইল’ গোত্রের বিশ্বাসঘাতকদের হাতে বন্দি হন। তারা তাঁকে মক্কার উকবা ইবনে হারেস ইবনে আমিরের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে।

তিনি বদর যুদ্ধে এই উকবার পিতাকে হত্যা করেছিলেন। তাই পিতার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য উকবা ইবনে হারেস তাঁকে আনন্দের সঙ্গে খরিদ করে এবং শিকলে বেঁধে একটি কক্ষে আবদ্ধ করে রাখে। কাফিররা যখন খুবাইব (রা.)-কে হত্যার পূর্ণ প্রস্তুতি নিল, তখন তিনি হারেসের এক কন্যার কাছে নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করার জন্য একখানা ক্ষুর চাইলেন। সে তাঁকে তা দিল। ইত্যবসরে তার অসতর্কতার মধ্যে তার একটি শিশু হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে খুবাইব (রা.)-এর কাছে। খুবাইব তাকে আদর করে কোলে নিলেন। হারেস কন্যাশিশুর খোঁজ নিয়ে যখন দেখতে পেল, শিশুটি খুবাইবের উরুর ওপর, আর খুবাইবের হাতে ক্ষুর—এ দৃশ্য দেখে সে আঁতকে উঠল। খুবাইব (রা.) বুঝতে পেরে বলেন, তুমি কি তোমার শিশুর ব্যাপারে এমন আশঙ্কা করছ যে আমি তাকে হত্যা করব। তা কখনোই নয়; আমাদের আদর্শ এমন নয়।
হারেসের এই কন্যা (পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর) বলেন, আমি খুবাইবের মতো উত্তম বন্দি দেখিনি। আমি তাকে আঙুরের থোকা থেকে আঙুর খেতে দেখেছি। অথচ তখন মক্কায় কোনো আঙুর ছিল না। অধিকন্তু তখন তিনি লোহার শিকলে বাঁধা ছিলেন। এ আঙুর তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত রিজিক ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

এরপর তারা খুবাইব (রা.)-কে হত্যা করার জন্য হারামের বাইরে ‘তানঈম’ নামের স্থানে নিয়ে গেল। সেখানে তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য ফাঁসিকাষ্ঠ প্রস্তুত করা হলো। ঢাকঢোল পিটিয়ে নারী-পুরুষ, বালক-বৃদ্ধ-নির্বিশেষে সব শ্রেণির লোক জড়ো করা হলো। কারণ খুবাইব (রা.)-এর ফাঁসিটি ছিল তাদের জন্য বড় ধরনের আনন্দের বিষয়। শত শত দর্শকের সামনে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁসি কার্যকর করা হবে। তখন খুবাইব (রা.) তাদের বললেন, তোমরা আমাকে দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ দাও। খুব সংক্ষেপে দুই রাকাত নামাজ পড়লেন; দীর্ঘ করলেন না। নামাজ শেষ করে বললেন, আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘায়িত করছি—তোমরা এমনটা না ভাবলে আমি নামাজকে আরো দীর্ঘায়িত করতাম। হত্যার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুন্নত তিনিই চালু করলেন।

এরপর তিনি মহান আল্লাহকে সাক্ষী করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! এদের একেক করে গুনে রাখুন। (একেক করে তাদের হত্যা করুন এবং তাদের কাউকে ছেড়ে দেবেন না’)। এর সঙ্গে আরো দুটি কবিতা আবৃত্তি করলেন।

(ক) আমি যখন মুসলমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করব, আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় আমার মরদেহ কোন পার্শ্বে ঢলে পড়ে—তার কোনো পরওয়া আমি করি না।

(খ) এসব যা কিছু হচ্ছে, সবই আল্লাহর জন্য। তিনি যদি চান বরকত দিতে পারেন, ছিন্নভিন্ন সকল অঙ্গে।

এরপর উকবা ইবনে হারেস (তার সহযোগীসহ) ফাঁসি কার্যকর করে। খুবাইব ফাঁসিকাষ্ঠে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে শাহাদাতবরণ করেন। এভাবে তিনিই হলেন সর্বপ্রথম সাহাবি, যিনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে শাহাদাতবরণ করলেন। (উসদুল গাবাহ ১/৫৯৯)

মৃত্যুর পর খুবাইব (রা.)-এর চেহারা কুদরতিভাবে কিবলামুখী হয়ে গেল। কাফিররা কিবলা থেকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। একবার নয়; বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।

কাফিররা খুবাইব (রা.)-কে হত্যা করার পর ফাঁসিকাষ্ঠেই ঝুলিয়ে রাখল; নিচে নামাল না। পাহারাদারির জন্য নিযুক্ত করল ৪০ জন লোক। তাদের সবাই ছিল বখাটে; নেশাগ্রস্ত। তারা লাশটি ঘিরে পাহারা দিচ্ছিল। এদিকে রাসুল (সা.) জানতে পারলেন খুবাইব (রা.) ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলন্ত অবস্থায় আছেন। তাঁর লাশটি উদ্ধার করার জন্য রাসুল (সা.) মিকদাদ ইবনে আমর (রা.) ও জুবাইর ইবনে আউওয়াম (রা.)-কে পাঠালেন। তাঁরা ‘তানঈম’-এ এসে দেখলেন ৪০ জন নেশাগ্রস্ত লোক খুবাইবের লাশটি পাহারা দিচ্ছে। তাঁরা সুকৌশলে লাশটি নামালেন। তখনো তাঁর লাশটি সম্পূর্ণ তরতাজা। জুবাইর (রা.) নিজের বাহনের ওপর খুবাইবের লাশটি ওঠালেন। এরই মধ্যে পাহারাদাররা টের পেয়ে তাঁকে ধাওয়া শুরু করল। বেগতিক অবস্থায় জুবাইর (রা.) লাশটি ফেলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর ভূমি খুবাইব (রা.)-এর লাশটি গিলে ফেলল। এ কারণে খুবাইব (রা.)-কে বলা হয় ‘বালিউল আরদ’ অর্থাৎ মাটি যাঁকে গিলে ফেলেছে।