জাতীয় ঢাকা প্রধান খবর সারাদেশ

বাপার অালোচনা সভা অনুষ্ঠিত

হটনিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন(বাপা) ও ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর উদ্যোগে আজ ৩১ জানুয়ারী ২০১৮, বুধবার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি হল কক্ষে “পোল্ট্রি ফিডে বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য; গভীর সংকটে জনস্বাস্থ্য! মুক্তির উপায় কী?” শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাপা’র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ফুড সেফটি নেটওয়ার্ক এর চেয়ারম্যান মহিদুল হক খান এর সভাপতিত্বে এবং বাপা’র যুগ্মসম্পাদক জনাব মিহির বিশ্বাস এর সঞ্চালনায় এতে মুল বক্তব্য রাখেন বাপা’র যুগ্মসম্পাদক ও নিরাপদ খাদ্য-পানীয় ও ভোক্তা অধিকার কর্মসূচীর সদস্য সচিব জনাব জাহেদুর রহমান। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এম আব্দুল মমিন, পশুসম্পদ ও পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ জনাব বিধান চন্দ্র দাস, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী এবং মিডিয়া এডভোকেসী কর্মকর্তা পরিবেশকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন।

মহিদুল হক খান বলেন, আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ সারাদেশে পালিত হবে। তবে শুধু দিবস পালন করলেই চলবে না, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। পোলট্রি মুরগী সাধারণ জনগনের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকাতে ধনী গরীব নির্বিশেষে এর কদর খুবই বেশী। তাছাড়া এটি আমাদের প্রোটিন চাহিদা পুরণের প্রধান উৎস। আমরা চাই পোল্ট্রি শিল্প টিকে থাকুক। হাইকোর্টের আদেশ বলে নিষিদ্ধ বিষাক্ত ট্যানারী বর্জ্য দিয়ে তৈরী ফিড বর্জন করার জন্য তিনি এ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের প্রতি আহবান জানান। পাশাপাশি এবিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে সজাগ থাকারও আহবান জানান।

জাহেদুর রহমান বলেন, পোল্ট্রি ও মাছের খাবারে (ফিড) পাওয়া যাচ্ছে বিষাক্ত ট্যানারির বর্জ্য। চামড়ার বর্জ্যে রয়েছে অত্যন্ত ক্ষতিকর উপাদান। এসব বর্জ্য দিয়ে মাছ ও মুরগীর খাবার তৈরি হচ্ছে, আর এই খাবার খাওয়ানোর ফলে মাছ ও মুরগীর শরীর হচ্ছে বিষাক্ত। আগে হাজারিবাগের বিভিন্ন স্থানে হত এই অপকর্ম। এখন ভাকুর্তার মোগড়াকান্দির চকে বিষাক্ত ট্যানারির বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে পোল্ট্রি ও মাছের খাবার (ফিড) তৈরির প্রাথমিক কাজ। অসাধু ব্যবসায়ীদের এই অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য দেশবাসীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। চামড়ার বর্জ্য থেকে পোল্টি ফিড তৈরি পুরো প্রক্রিয়াটি এতটা ভয়াবহ যে, না দেখলে বিশ্বাস হবে না। এতে বাড়ছে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং দূষিত হচ্ছে স্থানীয় কৃষি জমি, নদীর পানি, বাতাস ও পরিবেশ। তিনি বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে শতাধিক ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। চামড়া ফিনিশিং প্রক্রিয়ার শেষ স্তর পর্যন্ত কমপক্ষে ২০ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবেচেয় ভয়াবহ হল ক্রোমিয়াম। এটি আগুনে জ্বালালেও কোন ক্ষয় নেই। মাটিও হজম করতে পারেনা। কিন্তু সেই কেমিক্যাল আমাদের দেহে প্রবেশ করছে। ২০০৯ সালে আমরা জানতে পেরেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষনা পরিষদ যৌথভাবে কাজ করেছে চামড়ার বর্জ্য মিশ্রিত খাবার নিয়ে। এতে দেখা যায় যেসব এলাকায় এসব খাবার যাচ্ছে ঐ এলাকার ডিমে মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম নামে রাসায়নিক পদার্থ ধরা পড়েছে। ক্রোমিয়াম এবং সীসা মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি প্রবেশ করলে মানুষের লিভার, কিডনী, ব্রেন ও নার্ভাস সিস্টেম অচল হয়ে যায়। এতে একদিকে বিকলাংঙ্গ শিশুর জন্ম হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে নারীর প্রজননক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে। তিনি জানান, ক্ষতিকর এই বর্জ্যের বিষয়ে ২০১১ সালের ২১ জুলাই মহামান্য হাইকোর্ট বেঞ্চ এক মাসের মধ্যে বর্জ্যকে মাছ-মুরগির খাবার তৈরির কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করলে মহামান্য আপীল বিভাগ খারিজ করে দেন। এরপর ফের আবেদন (আপিল ফর রেস্টোরেশন) করলে ৯ এপ্রিল ২০১৭ খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ট্যানারি বর্জ্য থেকে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু আমরা অত্যন্ত হতাশার সাথে লক্ষ্য করেছি, উচ্চ আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা না মেনে দেদারসে ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে মাছ ও পোল্ট্রি ফিড। সাভারের ভাকুর্তার মোগরাকান্দি গ্রামে বিষাক্ত ফিড তৈরি হচ্ছে প্রায় ২০টি কারখানা থেকে। তাই ‘পোল্টি ফিডে বিষাক্ত ট্যানারির বর্জ্যে’ তৈরিতে নিয়োজিত সকল অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধে মহামান্য আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর আহবান জানান তিনি। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিরোধী ‘পোল্ট্রি ফিডে বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য’ কার্যক্রম বন্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন হওয়ার আহবান জানান। উপসংহারে তিনি বলেন যে, নিরাপদ খাদ্য আইন তৈরী হয়েছে কিন্তু এরপরও প্রায় পাঁচবছর অতিবাহিত হচ্ছে। এসময়ে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে যারা অসুস্থ্য বা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের দায় কে নেবে? আর কতদিন লাগবে সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ?

সৈয়দ সাইফুল আলম বলেন, পোল্ট্রি ফিডে বিষাক্ত ট্যানারী বর্জ্য ব্যবহার করছে বিশাল একটি গ্রুপ। সরেজমিনে তদন্ত করে অনেক তথ্য প্রমানসহ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করলেও এটি বন্ধে এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোন পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাইনি। তাছাড়া মহামান্য উচ্চ আদালতে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোন অজ্ঞাত কারনে অথবা প্রশাসনের গাফিলতির কারণে আদালতের আদেশ কার্যকর হচ্ছে না।

ড. এম আব্দুল মমিন বলেন, আমরা অসহায় অবস্থায় আছি, দেখার কেউ নেই। সারা বিশ্বেই মুনাফালোভী একটি চক্র রয়েছে, যারা নিজেদের লাভের দিকেই ছুটছে। এই চক্রের কারনেই নিরাপদ খাদ্য বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তাই এখন আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে অনিরাপদ খাবার আমরা গ্রহণ করবো না।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র সরকারের দিকে না তাকিয়ে নিজেরা সংঘবদ্ধভাবে নিরাপদ খাদ্য গ্রহনে কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহন করলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারীগন উৎসাহিত হবে এবং তা প্রাপ্তি নিশ্চিত হতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

বিধান চন্দ্র দাস বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সম্বিলিত উদ্যোগ এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার বাস্তবায়ন করা।

গাউস পিয়ারী বলেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফিড অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এটা না করতে পারলে ভবিষ্যত প্রজন্ম হুমকীর মুখে পড়বে। এটি নিশ্চিত করতে হবে সকলে মিলে এবং যার যার অবস্থানে থেকে।